সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● ছাত্র আন্দোলনের মুখে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ      ● নানা বিতর্কে আস্থা হারাচ্ছে বিএনপি      ● তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সংবিধানের দুই অনুচ্ছেদে গণভোট চায় বিএনপি      ● হাম ও ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল ১৫ জনের      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২১৫৮       ● হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৪১      ● জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে : মন্ত্রী টুকু      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের খাবারের মান ভালো হবে কবে
মো. মাফিদুল হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ। তার ওপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিন দেখলে মনে হয় যে, তারা নিম্মমানের একটি বস্তির হোটেলে খাবার খাচ্ছে। একেতো খাবারের মিম্নমান তার ওপর খাবারে পাাওয়া যাচ্ছে পোকা ও মাছি। মাঝে মধ্যে আস্ত তেলাপোকাও রান্না হয়ে চলে আসে শিক্ষার্থীদের খাবারের মাঝে।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি শিক্ষার্থী সময় পায় গড়ে তিন মাস। হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের স্বপ্নটি পূরণের উদ্দেশ্যে এই তিন মাস সবকিছু উৎসর্গ করে শুধু পড়াশোনায় লেগে থাকে। তারপর একজন শিক্ষার্থী হাড় ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিট পায়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় তার জীবনের আরও একটি যুদ্ধ। তখন একজন শিক্ষার্থীর কাছে মনে হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার থেকে সারভাইব করাটা আরও কঠিন। 

একজন শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে- তার মধ্যে একটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল ক্যান্টিনের খাবারের মান ও পরিবেশের সমস্যা। আমরা জানি, আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাবার হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ও ফ্রেশ খাবার শরীর ও মনকে ভালো রাখে। আর শরীর ও মন ভালো থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া যায়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অধিকাংশ সময় বাসি পচা ও নিম্ন মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় খাবারের মধ্যে তেলাপোকাসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পোকামাকড় পাওয়া যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে- একজন শিক্ষার্থী এত পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতা করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় পোকামাকড় খাওয়ার জন্য?

বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৩.৮৫% থেকে ৬৩% শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাস্তা না খেয়ে থাকেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী খাবার খান দুপুরে আর রাতে। কিন্তু এই দুবেলার খাবারও শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পান না। তাহলে একজন শিক্ষার্থীর গবেষণা বা নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখার সুযোগ কোথায়? কারণ তার পেটে তো থাকে সবসময় ক্ষুধা। পেটে ক্ষুধা নিয়ে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে তো একজন শিক্ষার্থী গবেষণার মানসিকতা খুঁজে পায় না। তখন একজন শিক্ষার্থী চিন্তা করে কোনোমতে পড়াশোনাটা শেষ করে দ্রুত চাকরির পেছনে ছুটতে হবে। 

খাবারের বিষয় নিয়ে হল প্রশাসনের দ্বারস্থ হলে সাধারণত শিক্ষার্থীদের অল্প বাজেটের কথা মেইন ইস্যু হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ হল প্রশাসনের ভাষ্যমতে ক্যান্টিনের খাবারের মান খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের অল্প টাকার বাজেটকেই দায়ী করা হয়। তাদের মতে, এই অল্প টাকার বাজেট দিয়ে ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা আরেকটু ভিন্ন। একই টাকার বাজেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনে খাবার না খেয়ে বাইরের সাধারণ হোটেলগুলোতে খাবার খেলে খাবার কোয়ালিটি বেশ কিছুটা ভালো পাওয়া যায়। তো এখন প্রশ্ন হচ্ছে- সেইম বাজেট দিয়ে বাইরে ভালো খাবার পাওয়া গেলে ক্যান্টিন কেন ভালো খাবার দিতে ব্যর্থ হবে? 

বিশ্ববিদ্যালয় হল ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে পরিচালিত এক পুষ্টিগত গবেষণা দেখা গেছে যে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর বয়স ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে (২৮০০-৩০০০) কিলোক্যালরি শক্তির প্রয়োজন হয়। কিন্তু হলের ক্যান্টিনে খাবার খাওয়া শিক্ষার্থী দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্র ১৪৪৯ কিলোক্যালরি পাচ্ছে যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এই চরম পুষ্টি ঘাটতির ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি, রক্তশূন্যতা ও মনোযোগহীনতায় ভুগছে। যা সরাসরি তাদের একাডেমিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনী উইলি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনগুলোতে খাবারের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। গবেষক দল ক্যান্টিনের খাবার যেমন (আলু ভর্তা ও মুরগির মাংস ) পরীক্ষা করে ই কুলাইসহ (ঊ.পড়ষর)-সহ ১৪ ধরনের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এছাড়াও বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিনের কর্মচারীদের ওপর পরিচালিত একটি ‘নলেজ, অ্যাটিটিউড অ্যান্ড প্র্যাকটিস (কঅচ)’ গবেষণায় দেখা গেছে যে মাত্র ৩১.৫% খাবার পরিবেশনকারী বা বাবুর্চির খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রয়েছে। এবং ২৮.৪% কর্মী রান্না ও পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলেন। 

অধিকাংশ হলের ক্যান্টিনে রান্নার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা স্বাস্থ্যবিধি (গ্লাভস পরা, চুল ঢাকা, বা নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া) সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। তাছাড়া অনেক ক্যান্টিনে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকে না। অস্বাস্থ্যকর পানি, অপরিচ্ছন্ন হাত, এবং বাসি ও পচা খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে প্রাণনাশী ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়, যা শিক্ষার্থীদের টাইফয়েড বা ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছে এমন রেকর্ডও রয়েছে। 

বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের আওয়াতাই যে কোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ বা ক্যান্টিনে ভেজাল বাসি, পচা ও জীবাণুযুক্ত খাবার পরিবেশন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনগুলোতে এই আইনের কার্যকারিতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দেয়ালকে এক ধরনের শিল্ড বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিয়মিত আইনি মনিটরিং বা মোবাইল কোর্টের অভিযান হলের ভেতরে পৌঁছতে পারে না। যার ফলে ক্যান্টিন মালিকরা এক ধরনের অদৃশ্য ইনডেমনিটি বা দায় মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। 

প্রতিটি হলেই একজন প্রভোস্ট এবং একাধিক আবাসিক শিক্ষক থাকেন। যাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়মিত তদারকি করা। কিন্তু বাস্তবে এই তদারকি খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা যখন একের পর এক ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করে তখনো প্রশাসন কোনো কার্যকর বা দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নেয় না। বরঞ্চ নামমাত্র একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় যার রিপোর্ট কোনোদিন আলোর মুখ দেখে না। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির দোহাই দিয়ে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতেও অনীহা প্রকাশ করে। অথচ হাজারও শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো বিলাসী প্রকল্পের চেয়ে অগ্রগণ্য তারা তারা ভুলে যান। চরম জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি মূলত হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনগুলোকে এক একটি অস্বাস্থ্যকর খাবারের ভাগাড়ে পরিণত করেছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার বদলে নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনকে বাজি রেখে প্রতিদিন টেবিলে বসতে বাধ্য হচ্ছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close