স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে দেশের বাজারে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার বারবার মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এই সময়ে এসে এই প্রক্রিয়ায় জনসাধারণের অর্থনৈতিক চাপ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসের গভীর মূল্যায়ন ও যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বৈশ্বিক মন্দার কারণে প্রথম দাম বাড়ে। তখন পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের জুলাই মাসে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে পুনরায় মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। সে সময় লিটারপ্রতি পেট্রোলের দাম পাঁচ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই বৃদ্ধির হার ছিল পূর্ববর্তী মূল্যের প্রায় পঁচিশ শতাংশ। কেরোসিনের দামও সে বছর তিন টাকা বাড়ানো হয়েছিল। মূলত বিশ্ববাজারের আকস্মিক সংকটের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তী ধাপে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণে এই সমন্বয় ঘটে। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি বৃদ্ধি পায় দুই টাকা। বৃদ্ধির এই হার ছিল প্রায় পনেরো শতাংশের সমান। এরপর ২০০১ সালের মে মাসে পুনরায় তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়। তখন অকটেনের দাম এক লাফে চার টাকা বৃদ্ধি পায়। দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় মেটাতে এই পদক্ষেপ ছিল।
২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপে দাম আবার বাড়ে। এবার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি বাড়ে তিন টাকা। শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় দশ ভাগ। এরপর ২০০৮ সালের জুলাই মাসে সরকার বড় মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণা করে। সে সময় পেট্রোল ও অকটেনের দাম পঁচিশ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। বিশ্ববাজারে তেলের ব্যারেল প্রতি দাম রেকর্ড ছাড়ানোয় এটি ঘটে।
২০১১ সালের মে মাসে ভর্তুকির চাপ কমাতে দাম বাড়ানো হয়। সে দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে দুই টাকা। শতাংশের হিসেবে এই বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় চার শতাংশ। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে আবার তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতি লিটার ডিজেলে সাত টাকা বৃদ্ধি করা হয়। পেট্রোল ও অকটেনের দামও সমহারে সাত টাকা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের লোকসান কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য পুনরায় সমন্বয় করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি ঘটে। তখন অকটেনের দাম লিটারপ্রতি বাড়ানো হয়েছিল প্রায় আট টাকা। এই বৃদ্ধির শতকরা হার ছিল প্রায় আট দশমিক পাঁচ শতাংশ। এরপর ২০২২ সালের আগস্ট মাসে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। সে সময় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ে চৌত্রিশ টাকা। বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে নতুন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ শুরু হয়। মে মাসে পেট্রোল ও অকটেনের দাম আড়াই টাকা বাড়ে। এই বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় দুই দশমিক এক শতাংশ। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আবার বৃদ্ধি পায়। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি চার টাকা বাড়ে। স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলার আওতাতেই এই মূল্য বৃদ্ধি কার্যকর করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শীতকালীন চাহিদার কারণে দাম বাড়ানো হয়। সে সময় কেরোসিন ও ডিজেলের দাম বাড়ে দুই টাকা। শতকরা হিসেবে এই বৃদ্ধির হার ছিল দুই শতাংশের কাছাকাছি। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বৈশ্বিক সংকটে দাম বাড়ে। প্রথম দফায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাড়ে পনেরো টাকা। কেরোসিন আঠারো টাকা এবং পেট্রোল উনিশ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় এই বৃদ্ধি ঘটে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এটি ঘটেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন মূল্যে চার ধরনের তেলের দামই একযোগে বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা। আগে এই ডিজেলের মূল্য ছিল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা। কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা। শতাংশের হিসেবে ডিজেলে ১৭.৪ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে অকটেন ও পেট্রোলের দামও একইভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতি লিটার অকটেনের নতুন মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ১৬৫ টাকা। এর আগের মাসে অকটেনের দাম ছিল ১৪৫ টাকা। পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসের তুলনায় এই মূল্য প্রায় ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজার। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ঘাটতি মেটাতে দাম বাড়ানো হয়। বিভিন্ন সময়ে এই বৃদ্ধির হার পাঁচ থেকে চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।
নিবন্ধ এই ধাপে আসছি আমাদের দেশীয় উৎপাদনের আদ্যপ্রান্তে। বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উপজাত হিসেবে কনডেনসেট পাওয়া যায়। সংগৃহীত কনডেনসেট থেকে পেট্রোল এবং অকটেন উৎপাদন করা হয়। এটি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা কিছুটা হলেও হ্রাস করে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে মূলত কনডেনসেট আসে। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ গ্যাস ক্ষেত্র কনডেনসেট সরবরাহে শীর্ষ ভূমিকা রাখছে। রশিদপুর এবং কৈলাশটিলা ক্ষেত্র থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরবরাহ পাওয়া যায়। দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে বার্ষিক প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন কনডেনসেট পাওয়া যায়।
এই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নির্দিষ্ট রিফাইনারি প্ল্যান্ট রয়েছে। সেখানে ফ্রাকশনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন জ্বালানি তেল তৈরি হয়। উৎপাদিত তেলের সিংহভাগই মূলত অকটেন এবং পেট্রোল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দেশীয় উৎপাদন মোট চাহিদার একটি ক্ষুদ্র অংশ পূরণ করে। এটি চাহিদার প্রায় সাত শতাংশ মাত্র।
দেশীয় উৎস থেকে বার্ষিক প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন পেট্রোল আসে। এই উৎপাদন দেশের অভ্যন্তরীণ পেট্রোলের চাহিদা সম্পূর্ণ মেটাতে পারে না। তবে এটি আমদানির বিশাল ব্যয় সাশ্রয়ে বড় অবদান রাখছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এই প্রক্রিয়াকরণে প্রধান ভূমিকা রাখে। এছাড়া কিছু বেসরকারি প্ল্যান্টও এই তেল উৎপাদনে যুক্ত আছে। পেট্রোলের পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে অকটেনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়। বার্ষিক প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন দেশীয় প্ল্যান্ট থেকে পাওয়া যায়। তবে ডিজেল ও কেরোসিন উৎপাদনের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। দেশীয় উৎস থেকে মাত্র কয়েক হাজার টন ডিজেল পাওয়া সম্ভব। ফলে ডিজেলের জন্য সম্পূর্ণ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই সময় দেশের মোট বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে মাত্র ৫ লাখ টনের মতো। বাকি ৬৫ লাখ মেট্রিক টন তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশীয় উৎপাদনও সমমূল্যে বিক্রি করা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে মনে করেন দেশীয় উৎপাদন আন্তর্জাতিক মূল্যে বিক্রি করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ দেশীয় তেল উত্তোলনে উৎপাদন খরচ আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কম। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সঠিক সুফল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হয়ে থাকে। তেল বিক্রির লভ্যাংশ নতুন খনি অনুসন্ধান ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা হয়। অতিরিক্ত রাজস্ব আয় দেশের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে থাকে। কিন্তু সাধারণ ভোক্তার জন্য এই সমতা বিধান অর্থনৈতিক কষ্ট বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সমপরিমাণ দাম কমানো হয় না। এই নীতিটি সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক হিসেবে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। বিশ্ববাজারে দাম কমলে তার সুফল দেশের সাধারণ ভোক্তারা পায় না। সরকার তখন পূর্বের লোকসান কাটানোর অজুহাতে দাম অপরিবর্তিত রাখে। এই দ্বিমুখী নীতি জনগণের অর্থনৈতিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম ২০ শতাংশ কমে, তখন দেশে বড়জোর ২ বা ৩ শতাংশ কমানো হয়। আবার অনেক সময় দীর্ঘ মেয়াদে দাম একেবারেই কমানো হয় না। অথচ বিশ্ববাজারে দাম ৫ শতাংশ বাড়লেই দেশে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই অসম মূল্য সমন্বয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই নীতির পক্ষে সরকারের কিছু অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার যুক্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলে সরকার পূর্বের ভর্তুকির টাকা পুনরুদ্ধার করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এই অর্থ দিয়ে ভবিষ্যৎ সংকটের তহবিল গঠন করে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সঞ্চয় প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়। কিন্তু স্বচ্ছতার অভাবে এই যুক্তির ন্যায্যতা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি মূল্যের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানির মূল্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা উচিত। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সুফল সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের দেওয়া উচিত। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেমন দ্রুততা দেখানো হয়, কমানোর ক্ষেত্রেও তা দেখানো উচিত। তবেই জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনস্বার্থ রক্ষা পাবে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস