প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহার, অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধারাবাহিক দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে একটি উদীয়মান অর্থনীতিকে সংকটে ফেলতে পারে, দেশের বর্তমান গ্যাস খাতের চিত্র যেন তারই একটি উদাহরণ। দেশের ২২টি সক্রিয় গ্যাসক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে। যদি নতুন কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান না মেলে, তাহলে আগামী ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবে।
অথচ বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে, আর সেই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর ৪৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার আকাশচুম্বী ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করা সত্ত্বেও সংকটের সমাধান তো দূরের কথা, পরিস্থিতির সামান্য উন্নতিও হচ্ছে না।
এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে বিগত এক-দেড় দশকের ভুল নীতি, কাঠামোগত পরিকল্পনার অভাব এবং ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অব্যাহত অবহেলা। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ১৫০টি কূপ খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হলেও মাত্র ৩০টি কূপের কাজ এ পর্যন্ত শেষ হয়েছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে তা থেকে প্রাপ্ত গ্যাসের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, এসব কূপ থেকে যোগ হয়েছে দৈনিক মাত্র ১২ কোটি ৫৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস। এদিকে, জ্বালানির এই তীব্র সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রায় দুই হাজার নতুন শিল্পকারখানার সংযোগ আবেদন থমকে আছে। বিপুল অঙ্কের ডিমান্ড নোট জমা দিয়েও চার-পাঁচ বছর ধরে শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগ শুরু করতে পারছেন না। চালু থাকা কারখানাগুলোও আজ পর্যাপ্ত গ্যাস চাপের অভাবে উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কায় দিন গুনছে, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি খাতকে ভয়াবহ ঝুঁকিতে ফেলছে।
এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং শিল্প খাতের পক্ষাঘাতগ্রস্ততা এড়াতে হলে সরকারকে এখনই আমদানিনির্ভরতার পথ থেকে সরে এসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ভূখণ্ডে বড় কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা যেহেতু সীমিত, সেহেতু বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্রে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান কাজ সম্পন্ন করাই এখন প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
এ ছাড়া, ভোলা অঞ্চলে থাকা মূল্যবান গ্যাসের সুফল পেতে জরুরি ভিত্তিতে ভোলার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী পাইপলাইন স্থাপনের কাজ অবিলম্বে শেষ করা আবশ্যক। পাশাপাশি বৈশ্বিক অভিজ্ঞ কোম্পানিগুলোর অনুসন্ধান প্রস্তাব ও সমঝোতার সম্ভাবনাগুলো দেশের সার্বিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কোনোরকম দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই মূল্যায়ন করতে হবে। তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কার্যকারিতা দ্রুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি দ্রুত সম্প্রসারিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
কেকে/ এমএস