বান্দরবানের বিস্তীর্ণ পর্বতশ্রেণি যুগের পর যুগ প্রকৃতির এ অনির্বচনীয় বাণী ধারণ করে এসেছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সেই নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে আরেকটি শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—আতঙ্কের শব্দ। শিশুর তীব্র জ্বর, শরীরজুড়ে লালচে দানা, উদ্বিগ্ন মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখ এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের দিকে ছুটে চলা মানুষের ব্যাকুলতা—সব মিলিয়ে পাহাড় যেন এক অদৃশ্য বিপদের অভিঘাতে কেঁপে উঠছে। বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আজ কোনো বিচ্ছিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক সংবাদমাত্র নয়; এটি আমাদের জনস্বাস্থ্যের গভীরে জমে থাকা বহু বছরের অব্যবস্থাপনা, বৈষম্য, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও দীর্ঘ অবহেলার এক নির্মম উন্মোচন।
একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মাপকাঠি তার সুউচ্চ অট্টালিকা বা বাহ্যিক পরিকাঠামোয় নির্ধারিত হয় না, বরং তা পরিমাপ করা হয় তার সবচেয়ে অরক্ষিত শিশুদের স্বাস্থ্য ও সার্বিক নিরাপত্তায়। যে ভূখণ্ডে প্রতিরোধযোগ্য একটি সংক্রামক ব্যাধি বারবার ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়, সেখানে উন্নয়নের অসার ভাষণ নিঃসন্দেহে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রা হামকে বহু আগেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং নির্মূলযোগ্য রোগের কাতারে নিয়ে এসেছে। কার্যকর টিকাদান, সময়মতো নির্ভরযোগ্য রোগনির্ণয় এবং সঠিক জনসচেতনতা থাকলে এ ব্যাধি কোনোভাবেই মহামারির রূপ নেওয়ার সুযোগ পায় না। তবু বান্দরবানের বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ অন্য এক করুণ গল্প বলে—সেই গল্পে আছে দুর্গম পথ, প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন জনপদ, অত্যন্ত সীমিত চিকিৎসাসেবা এবং অরক্ষিত শৈশবের দীর্ঘশ্বাস।
বান্দরবানের এ প্রাদুর্ভাব আমাদের সামনে একটি মৌলিক ও কঠোর সত্য উন্মোচিত করেছে—স্বাস্থ্যসেবা শুধু ইটের পর ইট গেঁথে আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণের নাম নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। পাহাড়ের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে সেই অঙ্গীকারের বহু অংশ আজও অপূর্ণ থেকে গেছে। কোথাও চিকিৎসকের অনুমোদিত শূন্য পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকে, কোথাও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জীবনরক্ষাকারী উপাদানের মারাত্মক ঘাটতি, আবার কোথাও রোগনির্ণয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পুরোপুরি অনুপস্থিত। তদুপরি জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নির্ভরযোগ্য অ্যাম্বুলেন্স বা পরিবহন ব্যবস্থাও অনেক এলাকাতেই অপ্রতুল। ফলে সময়ের সঙ্গে বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত রোগের কাছে মানুষই পরাজিত হতে থাকে।
হাম অত্যন্ত তীব্র সংক্রামক একটি ব্যাধি, যা বিস্তারের জন্য মানুষের সামান্য অসচেতনতাকেও হাতছাড়া করে না। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি, কাশি কিংবা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে নতুন নতুন সংক্রমণের পথ তৈরি হতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুদের সার্বিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে এই ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়াও অপুষ্টি, ভিটামিন ‘এ’-এর তীব্র ঘাটতি এবং উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসা পাওয়ার বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও আশঙ্কাজনক করে তোলে। এ বাস্তবতায় প্রতিটি মুহূর্তের বিলম্ব নতুন শঙ্কার জন্ম দেয়।
টিকা প্রদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ও এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ। সেই সাফল্যের আলোকরেখা বহু সংক্রামক রোগকে সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবু পাহাড়ি অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনবসতি, মৌসুমভিত্তিক সামাজিক স্থানান্তর, সঠিক তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রান্ত ধারণা আজও অনেক শিশুকে পূর্ণাঙ্গ টিকার আওতার বাইরে রেখে দিচ্ছে। এটি মনে রাখা জরুরি যে, একটি শিশুর অপূর্ণ টিকাদান শুধু কোনো একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ভাগ্যবিপর্যয় নয়; এটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার শৃঙ্খলে সবচেয়ে দুর্বল বিন্দু, যেখান দিয়ে মহামারি অত্যন্ত সহজে প্রবেশের পথ খুঁজে নেয়।
এ মানবিক সংকটের নেপথ্যে আরেকটি বেদনাদায়ক সামাজিক বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা ও প্রকৃতি নিয়ে আমাদের মূলধারার আলোচনা সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে পর্যটনের রঙিন ভাষায়, ছবির অ্যালবামে কিংবা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কাব্যিক বর্ণনায়। অথচ তাদের মৌলিক স্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ মাতৃত্ব কিংবা শিশুকল্যাণের মতো জরুরি বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার পরিসর বিস্ময়করভাবে সংকুচিত। ফলে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত এ প্রান্তিক মানুষের অবদমিত কণ্ঠস্বর ক্ষমতার নীতিনির্ধারণী করিডরে খুব কমই পৌঁছায়। হামের বর্তমান পরিস্থিতি সেই নীরব কাঠামোগত ব্যবধানকে আমাদের সামনে আবারও উন্মুক্ত করে দিল।
অতএব, এ সংকটে আমাদের প্রধান কাজ কেবল রোগের পরিসংখ্যান গণনা করা নয়, বরং মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিটি দুর্গম ও প্রান্তিক গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত পদচারণা নিশ্চিত করা, শতভাগ শিশুর টিকাদান সম্পন্ন করা এবং প্রতিটি অভিভাবকের মনে স্বাস্থ্যসেবার ওপর পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনা—এ তিনটি লক্ষ্য অর্জিত হলেই আমাদের জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি প্রকৃত অর্থেই সুদৃঢ় হবে। অন্যথায় পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য বারবার এমনসব ব্যাকুল আর্তনাদ ধারণ করবে, যা আমাদের উন্নয়নের সব বাহ্যিক অর্জনকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।
আজ অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন হলো এ সংকটকে সংবাদ শিরোনামের ক্ষণস্থায়ী আলো থেকে বের করে এনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের সুপরিকল্পিত বিস্তার, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জরুরি ওষুধ ও পরীক্ষাসামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা, দুর্গম এলাকা থেকে জরুরি রোগী পরিবহনের নির্ভরযোগ্য পরিকাঠামো এবং মাতৃভাষাভিত্তিক স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক ব্যাপক প্রচারকাজ পরিচালনা করা এখন আর কোনো অলস বিলম্বের সুযোগ রাখে না। জনস্বাস্থ্য কোনো করুণা বা অনুদান নয়, এটি সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যখন একটি সাধারণ শিশুর জীবনরক্ষা নিশ্চিত হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থাও সমানতালে দৃঢ় হয়ে ওঠে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রয়াসই পারে এ সংক্রমণের শৃঙ্খলকে চিরতরে ছিন্ন করতে।
বান্দরবানের পাহাড় আজও গভীর সবুজে আচ্ছাদিত, পাহাড়ি ঝরনা আজও নিরবচ্ছিন্ন সুর তোলে, মেঘের দল আজও শৃঙ্গের কাঁধে সগৌরবে ভেসে বেড়ায়; তবু অসুস্থ শিশুর অনবরত কান্না সেই অসীম সৌন্দর্যের ওপর এক বিষাদময় করুণ আবরণ টেনে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিটি সংকট মানুষকে দুটি স্পষ্ট পথের সামনে এনে দাঁড় করায়—উদাসীনতার অন্ধগলি অথবা দায়িত্ববোধের আলোকিত অভিযাত্রা।
সময়ের আহ্বান আজ অত্যন্ত স্পষ্ট; এই জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত অশনিসংকেতকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। আজ আমাদের নেওয়া সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বান্দরবান সুস্থ শৈশবের হাসিতে মুখর হবে, নাকি প্রতিরোধযোগ্য কোনো রোগের পুনরাবৃত্ত শোকগাথা বহন করবে। পাহাড়ের প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করাই হোক আধুনিক রাষ্ট্রের মানবিক প্রজ্ঞা, প্রকৃত উন্নয়নের মূল মানদণ্ড এবং সমগ্র জাতির বিবেকের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী, আলীকদম, বান্দরবান
কেকে/ এমএস