কখনও কখনও একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলে। একটি নামফলকও ইতিহাসের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক চেতনাকে স্পষ্ট করে তোলে। সম্প্রতি মহাকবি কায়কোবাদ সেতুর নামফলকটি দেখে একটি প্রশ্ন বারবার মনে জাগে- এই সেতুর প্রকৃত পরিচয় কী? এটি কি মহাকবি কায়কোবাদের স্মৃতিকে ধারণ করার জন্য নির্মিত, নাকি উদ্বোধনকারীর পরিচয় তুলে ধরার জন্য?
নামফলকটির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে উদ্বোধনকারীর নাম। অথচ যে মনীষীর নামে সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে, তার নাম তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত। বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা পদকে ছোট করার নয়। রাষ্ট্রের প্রধান বা উদ্বোধনকারী হিসেবে তার নাম অবশ্যই থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত কার?
যার নামে স্থাপনার নাম, যার অবদানকে স্মরণ করার জন্য এই নামকরণ, তার নামই তো হওয়া উচিত সবচেয়ে দৃশ্যমান, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। কারণ স্থাপনার উদ্দেশ্য কোনো অনুষ্ঠানের স্মৃতি বহন করা নয়; বরং একজন মনীষীর অবদানকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।
কায়কোবাদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তার মহাশ্মশান বাংলা কাব্যভাণ্ডারের এক অমূল্য সম্পদ। অথচ আজ তার সাহিত্য, তার জীবন ও তার অবদান আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে ক্রমেই আড়াল হয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে তার উপস্থিতি ক্ষীণ হয়েছে, গবেষণা সীমিত, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও অপ্রতুল। সেই প্রেক্ষাপটে এই নামফলক যেন একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতীক-যেখানে মহাকবির নাম আছে, কিন্তু তার প্রাপ্য মর্যাদা নেই।
একটি জাতি তার মনীষীদের কতটা সম্মান করে, তা কেবল বক্তৃতা বা স্মরণসভায় নয়; প্রকাশ পায় তার স্থাপত্যে, স্মৃতিফলকে, ভাস্কর্যে, পাঠ্যক্রমে ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো তাদের সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের নাম ও অবদানকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। কারণ তারা জানে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মনীষীদের কীর্তি কালজয়ী।
আমাদেরও সেই চর্চা গড়ে তুলতে হবে। যে স্থাপনা মহাকবি কায়কোবাদের নামে, সেখানে তার নামই হওয়া উচিত সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে স্পষ্ট ও সবচেয়ে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপিত। উদ্বোধনকারীর তথ্য থাকবে, কিন্তু তা যেন মূল পরিচয়কে আড়াল না করে।
কায়কোবাদের ৭৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই নামফলক আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি সত্যিই আমাদের জাতীয় মনীষীদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে শিখেছি, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে তাঁদের স্মরণ করি?
ইতিহাসের বিচারে পদ-পদবি নয়, টিকে থাকে কীর্তি। আর যে সেতুর নাম মহাকবি কায়কোবাদ সেতু, সেই সেতুর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিচয়ও হওয়া উচিত- মহাকবি কায়কোবাদ। তার নামের মর্যাদা রক্ষা করা মানে শুধু একজন কবিকে সম্মান জানানো নয়; বরং বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাকেই সম্মান জানানো।
কেকে/এমএ