বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে— দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে কারা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প কিংবা রপ্তানি খাতের পাশাপাশি যে শক্তির কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, সেটি হলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যখন চাপ তৈরি হয়, আমদানি ব্যয় সামাল দিতে যখন সরকার হিমশিম খায় কিংবা ডলার সংকটে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই বিদেশে ঘাম ঝরানো লাখো প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। রাষ্ট্র যখন রেমিট্যান্সের নতুন রেকর্ড উদযাপন করে, তখন সেই রেকর্ড গড়া মানুষগুলোর জীবনের বাস্তবতা খুব কমই আলোচনায় আসে। অর্থনীতির পরিসংখ্যানে তারা নায়ক, কিন্তু বাস্তব জীবনে তারা প্রায়ই অবহেলিত। বিমানবন্দরে হয়রানি, দালালচক্রের প্রতারণা, বিদেশে শ্রম অধিকারহীনতা, দেশে ফিরে পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে প্রবাসীদের জীবন যেন এক নীরব সংগ্রামের নাম। অর্থনীতির সফলতার গল্পের আড়ালে চাপা পড়ে যায় সেই মানুষগুলোর না-বলা গল্প।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ চ্যানেলে দেশে এসেছে প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭.৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের কাতারে স্থান দিয়েছে।
এ বিপুল অর্থের অর্থনৈতিক তাৎপর্য বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে। দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয় নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি করে স্থানীয় বাজারকে সচল রাখে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত পরিবারগুলোর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন খাতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনেও প্রবাসী আয়ের বড় অবদান রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ বিশ্বের ১৭৪টি দেশে কর্মরত। এদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চালক, গৃহকর্মী কিংবা বিভিন্ন স্বল্পদক্ষতার পেশায় নিয়োজিত। এ শ্রমিকদের অনেকেই প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন। ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করা, সংকীর্ণ আবাসনে বসবাস, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা, অনিয়মিত বেতন এবং পরিবার থেকে বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন থাকা তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে ফিরে তারা খুব কমই পান তাদের প্রাপ্য সম্মান।
রেমিট্যান্সের এ সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের নানা ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করেছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক ঋণের চাপ— এসব সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। এমনকি নতুন অর্থবছরের শুরুতেও রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— আমরা কি প্রবাসীদের মানুষ হিসেবে দেখি, নাকি কেবল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মেশিন হিসেবে দেখি?
রাষ্ট্রীয় ভাষণে তাদের বলা হয়, ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’, ‘অর্থনীতির নায়ক’, ‘উন্নয়নের অংশীদার’। কিন্তু এসব পোশাকি প্রশংসা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। একজন প্রবাসী বিদেশে যাওয়ার আগেই দালালের কাছে সর্বস্ব হারান, বিদেশে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিভঙ্গের শিকার হন, আইনি সুরক্ষা পান না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না, আবার দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে সরকারি সেবায় নানা ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হন। এ বৈপরীত্য শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ও।
তাত্ত্বিক স্টিফেনের মতে, অভিবাসন শুধু একজন মানুষের স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ককেও গভীরভাবে পরিবর্তন করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, আমরা রেমিট্যান্সের হিসাব রাখি, কিন্তু সেই অর্থের পেছনে থাকা মানুষের মানসিক চাপ, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা সামাজিক মূল্য নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ অবদানের বিনিময়ে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে ৪,৮১৩ জন বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার অভিবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এ সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি হাজারো পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের প্রতীক।
অর্থনীতির ভাষায় রেমিট্যান্স একটি ‘ইনফ্লো’— বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একজন বাবার সন্তানের শৈশব হারানোর গল্প, একজন মায়ের অপেক্ষা, একজন স্ত্রীর একাকিত্ব এবং একজন শ্রমিকের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় বিদেশের মাটিতে উৎসর্গ করার ইতিহাস। এ মানবিক মূল্যকে উপেক্ষা করে কেবল রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ানোর নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু রেমিট্যান্সের অঙ্ক বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রবাসীদের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করাও সমান জরুরি। কারণ, অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্যই; মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন। নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী কিংবা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা এসব মানুষের অনেকেই প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন। গ্রীষ্মকালে ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করা শুধু কষ্টকর নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও। সংকীর্ণ আবাসন, অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিম্নমানের খাবার এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। তবুও তারা নিজের প্রয়োজনকে বিসর্জন দিয়ে পরিবারের জন্য নিয়মিত অর্থ পাঠিয়ে যান।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, এ মানুষগুলো বিদেশে থেকেও নিরাপদ নন, আবার নিজের দেশেও অনেক সময় সম্মান পান না। বিমানবন্দরে হয়রানি, লাগেজ হারানো, অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ বহু বছরের। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উন্নতি হয়েছে, তবুও সেবার মান এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যে মানুষটি দেশের অর্থনীতিতে হাজার হাজার ডলার যোগ করেছেন, তিনিই দেশে ফিরে অনেক সময় নিজেকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে অনুভব করেন। এ অভিজ্ঞতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার নয়; এটি রাষ্ট্রের মূল্যবোধেরও প্রশ্ন।
প্রবাসীদের দুর্ভোগের আরেকটি বড় কারণ হলো হুন্ডি। সাধারণভাবে মনে করা হয়, হুন্ডি ব্যবহার করেন প্রবাসীরাই। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সময় বেশি লাগা, ভাষাগত সমস্যা, ব্যাংক হিসাব না থাকা এবং খোলাবাজারের তুলনায় কম বিনিময় হার— এসব কারণে অনেক শ্রমিক হুন্ডির দিকে ঝুঁকে পড়েন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৬৬ শতাংশ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠান এবং তাদের ৬৪ শতাংশের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। অর্থাৎ শুধু আইন প্রয়োগ করে হুন্ডি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর পেছনের কাঠামোগত কারণগুলো দূর করতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে। যদি বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত, ডিজিটাল এবং লাভজনক করা যায়, তাহলে প্রবাসীরাই স্বেচ্ছায় বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাবেন। শুধু নগদ প্রণোদনা বাড়ানো নয়; বিদেশে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, মোবাইলভিত্তিক নিরাপদ লেনদেন, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ আর্থিক পণ্য এবং কম খরচে অর্থ পাঠানোর সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রবাসীদের জীবন শুধু অর্থনৈতিক চাপেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকট। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে সন্তানদের সঙ্গে আবেগিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সন্তান বাবাকে কেবল অর্থ পাঠানো একজন মানুষ হিসেবেই চেনে; বাবার ত্যাগ, সংগ্রাম কিংবা ভালোবাসার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের থাকে না। অন্যদিকে, স্ত্রীকে একাই সংসারের সব দায়িত্ব বহন করতে হয়। বৃদ্ধ মা-বাবার অসুস্থতার সময় ছেলের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকে একটি ফোনকল বা ভিডিও কলে। এই বিচ্ছিন্নতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক ও মানসিক বিকাশেও প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক চাপও কম নয়। সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা রয়েছে— বিদেশ মানেই অঢেল অর্থ। ফলে একজন প্রবাসীর ওপর পরিবারের প্রত্যাশার শেষ থাকে না। বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, আত্মীয়ের চিকিৎসা, ব্যবসার মূলধন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের ব্যয়— সবকিছুর দায়িত্ব যেন তার একার। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শ্রমিক সীমিত আয়ে নিজের প্রয়োজন কমিয়ে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান। বেতন আটকে যাওয়া, চাকরি হারানো কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো বাস্তবতা পরিবার সব সময় উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে অর্থ পাঠাতে সামান্য দেরি হলেও অভিযোগ ও মানসিক চাপ বাড়তে থাকে।
এদিকে দেশে পাঠানো অর্থ দিয়ে কেনা জমি কিংবা নির্মিত বাড়িও অনেক সময় নতুন সংকট তৈরি করে। বিদেশে অবস্থান করার সুযোগে অনেক প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের প্রতারণা, জমি দখল, জালিয়াতি কিংবা উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। বিদেশে বসে আদালতের মামলা পরিচালনা করা কিংবা প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় বিদেশে কাটানোর পর দেশে ফিরে অনেকেই দেখতে পান, কষ্টার্জিত সম্পদ নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন যুদ্ধ।
সবচেয়ে উপেক্ষিত বিষয়টি হলো প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য। দীর্ঘ একাকিত্ব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চিত চাকরি, অর্থনৈতিক চাপ এবং ভবিষ্যতের উদ্বেগ অনেককে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর বিভিন্ন গবেষণায় অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে এ বিষয়টি এখনো প্রায় অনালোচিত।
একটি সভ্য রাষ্ট্র কেবল নাগরিকের পাঠানো অর্থের মূল্যায়ন করে না; তার জীবন, মর্যাদা এবং মানবিক অধিকারও সমানভাবে নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় প্রবাসীদের অবদান যত বড়, রাষ্ট্রের দায়ও তত বড়। তাদের শ্রমকে সম্মান জানাতে হলে শুধু রেমিট্যান্সের রেকর্ড উদযাপন করলেই চলবে না; নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, আইনি সুরক্ষা, দূতাবাসের কার্যকর সেবা, সহজ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং দেশে ফিরে মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের সুযোগ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় একটি অস্বস্তিকর সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে— আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছি, যেখানে রেমিট্যান্স আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে, ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কিংবা আমদানি ব্যয় সামাল দিতে আমরা যতটা প্রবাসীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, ততটা নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো অর্থনীতির জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়। কারণ, রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হলেও এটি কখনোই টেকসই শিল্পায়ন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কিংবা কর্মসংস্থানের বিকল্প হতে পারে না।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বরং বিপুলসংখ্যক তরুণকে বিদেশে কাজ খুঁজতে বাধ্য হওয়া আমাদের শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। দক্ষ মানবসম্পদ যদি দেশের শিল্প, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে পর্যাপ্ত সুযোগ না পায়, তাহলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভারসাম্যের মধ্যে আটকে যাবে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বড় অংশ এখনো উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ অর্থ ব্যয় হয় পারিবারিক ভোগ, বাড়ি নির্মাণ, জমি ক্রয় কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে। এসব ব্যয় অবশ্যই সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এর ভূমিকা সীমিত। রাষ্ট্র যদি বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে প্রবাসীদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা রপ্তানিমুখী উদ্যোগে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে, তাহলে একই অর্থ বহু মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় অভিবাসন নীতি। বিদেশে যাওয়ার আগে দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা, শ্রম আইন সম্পর্কে ধারণা এবং আর্থিক পরিকল্পনার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিদেশে অবস্থানকালে দূতাবাসকে শুধু পাসপোর্ট নবায়নের কার্যালয় হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর সেবাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আইনি সহায়তা, শ্রমিকের অভিযোগ নিষ্পত্তি, জরুরি চিকিৎসা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা দূতাবাসগুলোর থাকতে হবে।
একইসঙ্গে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচিও অত্যন্ত জরুরি। বহু মানুষ ১৫ থেকে ২০ বছর বিদেশে কাজ করার পর দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে চান। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সঞ্চয়কে কাজে লাগানোর মতো কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই সীমিত। সহজ শর্তে ঋণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ পরামর্শ, কর-সুবিধা এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা গেলে তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হবেন না, নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবেন।
প্রবাসীদের সামাজিক নিরাপত্তাও নতুনভাবে ভাবতে হবে। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে দেশে ফিরে অনেকেই অসুস্থতা, বার্ধক্য ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। তাই রেমিট্যান্সের সঙ্গে সমন্বিত প্রবাসী পেনশন স্কিম, স্বাস্থ্যবিমা, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি। এতে প্রবাসজীবনের শেষভাগে তাদের জীবন আরও মর্যাদাপূর্ণ হবে।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে ভালোবাসি, কিন্তু অনেক সময় মানুষটিকে ভালোবাসতে শিখিনি। বিদেশে থাকা অবস্থায় তাদের প্রতি পরিবারের প্রত্যাশা থাকে সীমাহীন, কিন্তু তাদের মানসিক কষ্ট, একাকিত্ব কিংবা স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা খুব কমই ভাবা হয়। আবার দেশে ফিরে অনেকেই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, আত্মীয়স্বজনের প্রতারণা কিংবা সামাজিক অবহেলার শিকার হন। এ মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শুধু সরকারি নীতি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না।
হুন্ডি প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রবাসীরা কেন হুন্ডি ব্যবহার করেন, তার অর্থনৈতিক কারণগুলো সমাধান করতে হবে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দ্রুত, কম খরচে এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হারে অর্থ পাঠানোর সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে অবৈধ লেনদেন অনেকটাই কমে আসবে। একইসঙ্গে অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আর্থিক সুশাসনের সংকট দূর করাও সমান জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— রাষ্ট্রকে প্রবাসীদের নিয়ে তার ভাষা বদলাতে হবে। ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ শব্দটি কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে নীতিতে, বাজেটে এবং প্রশাসনিক আচরণে। একজন প্রবাসী বিমানবন্দরে নামার মুহূর্ত থেকে সরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক সেবা পাবেন— এটি তার অনুগ্রহ নয়, সাংবিধানিক অধিকার।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল উঁচু ভবন, বড় সেতু কিংবা রিজার্ভের অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো, যে মানুষগুলো সেই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করেন, তাদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে।
আমরা কি শুধু রেমিট্যান্স চাই, নাকি সেই রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষগুলোর জন্যও একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন চাই?
যদি দ্বিতীয় উত্তরটিই আমাদের বিবেকের উত্তর হয়, তাহলে এখনই নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ, প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নন; তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব স্থপতি, উন্নয়নের অদৃশ্য কারিগর এবং কোটি মানুষের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা একেকজন সংগ্রামী নাগরিক। তাদের ঘামের মূল্য শুধু ডলারে নয়; রাষ্ট্রের সম্মান, সমাজের কৃতজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের মধ্যেও পরিমাপ করতে হবে।
রেমিট্যান্সের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক রাখতে পারে, কিন্তু একজন প্রবাসীর চোখের জল, হারিয়ে যাওয়া যৌবন, সন্তানের সঙ্গে কাটাতে না পারা শৈশব কিংবা পরিবারের জন্য বিসর্জন দেওয়া জীবনের মূল্য কোনো পরিসংখ্যান কখনো ধারণ করতে পারবে না। তাই উন্নয়নের নতুন দর্শন হোক— রেমিট্যান্স নয়, প্রবাসীকেও মূল্য দিন। তাহলেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা হবে আরও মানবিক, আরও টেকসই এবং আরও মর্যাদাপূর্ণ।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/এলএ