সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭ জন      একদিনের সফরে বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী      রাজধানীতে জলাবদ্ধতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আইপিএল থেকে বিশ্বকাপ : এক সিদ্ধান্তে দুই দেশের দূরত্ব
ড. মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ক্রিকেট—এই দুইয়ের সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি আলাদা ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে রাজনৈতিক টানাপোড়েন সরাসরি ক্রিকেটের মাঠে এসে পড়ছে, তা উদ্বেগজনক। বিশেষত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত, আইপিএলকে ঘিরে বিতর্ক এবং আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক জটিল মোড় নিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক রদবদলের পর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও এক ধরনের পুনর্বিন্যাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুস্তরবিশিষ্ট  সহযোগিতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং কখনো কখনো মতপার্থক্য একসঙ্গে বিদ্যমান। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্বের ধারণা জোরালো হচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। এই ধারণা বাস্তবতার কতটা কাছাকাছি-সে প্রশ্ন আলাদা; তবে জনমনে এর প্রতিফলন যে তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঘটনাটি শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও সফল পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল  থেকে বাদ দেওয়ার পর। 

আইপিএল শুধুমাত্র একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ নয়; এটি বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী বাণিজ্যিক মঞ্চ। সেখানে খেলোয়াড় নির্বাচন, দলবদল কিংবা চুক্তি বাতিল-সবকিছুরই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া থাকে। মোস্তাফিজকে ঘিরে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সিদ্ধান্ত এবং সেটিকে ঘিরে ভারতীয় প্রশাসন ও ক্রিকেট বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশের ক্রিকেট মহলে প্রশ্ন তুলেছে-ক্রিকেট কি কেবল খেলাই থাকছে, নাকি রাষ্ট্রনৈতিক সিদ্ধান্তের অধীন হয়ে পড়ছে? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে চুক্তি বাতিল নতুন কিছু নয়। খেলোয়াড়ের ফর্ম, চোট, দলগত কৌশল-নানা কারণে দল সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। কিন্তু যখন কোনো সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাষ্ট্রনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে, তখন সেটি আর কেবল ক্রীড়াগত সিদ্ধান্ত থাকে না; তা পরিণত হয় কূটনৈতিক ইস্যুতে। মোস্তাফিজ ইস্যুতে ঠিক কী ঘটেছে—সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা যতই সীমিত থাকুক, জনমনে যে বার্তা গেছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। 

দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে রাজনীতির প্রভাব নতুন নয়। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ থাকা, আইসিসি ইভেন্টে নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবি-এসবই রাজনীতির অপছায়া। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সে তুলনায় অনেক বেশি সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সিরিজ, আইপিএল-বিপিএলে খেলোয়াড় বিনিময়, কোচিং ও প্রশাসনিক সহযোগিতা-সবই সেই সম্পর্কের সাক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই সম্পর্কও চাপের মুখে পড়তে পারে।

ক্রিকেট যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলাটিই। খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতি নষ্ট হয়, দর্শকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয় এবং সর্বোপরি ক্রীড়াঙ্গনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

আইপিএল বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে চলে এসেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) খেলোয়াড় ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা প্রকাশ করেছে, সেটি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিরাপত্তা একটি মৌলিক বিষয়। কোনো দলের যদি মনে হয় তাদের খেলোয়াড় কিংবা সমর্থকরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তাহলে সেই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়াই আইসিসির দায়িত্ব।

বিসিবির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ ছিল মূলত ঝুঁকি কমানোর একটি কৌশল। কিন্তু আইসিসির সিদ্ধান্ত-বাংলাদেশকে ভারতেই খেলতে হবে—এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আইসিসি বরাবরই বলে থাকে, তারা রাজনীতির বাইরে থেকে ক্রিকেট পরিচালনা করতে চায়। তবে বাস্তবতা হলো, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব আইসিসির সিদ্ধান্তে কখনো কখনো প্রতিফলিত হয়। পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপ বয়কটের পথে যায়, তাহলে সেটি হবে এক চরম সিদ্ধান্ত। বিশ্বকাপ বয়কট মানে শুধু একটি টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্থিক ক্ষতি, র‌্যাঙ্কিং প্রভাব, খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। অন্যদিকে, সব উদ্বেগ উপেক্ষা করে খেলতে গেলে যদি সত্যিই কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তার দায়ভার কে নেবে—সে প্রশ্নও থেকেই যায়। অতীতে বিশ্ব ক্রিকেটে বয়কটের নজির খুব একটা সুখকর নয়। রাজনীতির প্রতিবাদে খেলাধুলা বর্জন অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে খেলাটিরই ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এই সিদ্ধান্ত সহজ নয়।

ক্রিকেটের সংকটকে আলাদা করে দেখলেও বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক দূরত্ব কেবল ক্রীড়াঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাবে দুই দেশের মধ্যে ভিসা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, উভয় দেশই নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কারণ দেখিয়ে একে অপরের নাগরিকদের ভিসা প্রদান সীমিত কিংবা বাতিল করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ-শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক, ব্যবসায়ী-সকলেই চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। বহু বছর ধরে যে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল, তা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই ভিসা সংকটের পাশাপাশি আরও গুরুতর প্রভাব পড়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় আমদানি উৎস এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশও ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পণ্য রপ্তানি ও আমদানিতে নানামুখী বাধা সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরে পণ্য খালাসে জটিলতা, নতুন এলসি খোলার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ি—সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে—ভারত থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইয়েসসহ কিছু নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। শুধু ইয়েস নয়, আরও কয়েকটি ভোগ্য ও শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রেও আমদানি সীমিত বা বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক বার্তা বহন করলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অসম ভারসাম্যের অভিযোগে আলোচিত। তবু এই বাণিজ্য প্রবাহ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ব্যাহত হলে ক্ষতি উভয় পক্ষেরই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি ভারতের রপ্তানিকারকরাও বড় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভিসা ও বাণিজ্য সংকটের এই বাস্তবতা ক্রিকেট সংকটকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। যখন সাধারণ নাগরিকের চলাচল সীমিত, ব্যবসায়িক আস্থা নড়বড়ে এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বোঝা ছাড়া আইপিএল থেকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত তৈরি হওয়া সংকটের গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রিকেট শক্তি। আইসিসির অর্থনৈতিক কাঠামোতেও ভারতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই অবস্থান থেকে ভারতের দায়িত্ব আরও বেশি। খেলাধুলাকে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে রাখা, প্রতিবেশী দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসবই ক্রীড়া কূটনীতির অংশ। ভারত সরকার ও ক্রিকেট বোর্ড যদি স্পষ্টভাবে দেখাতে পারে যে ক্রিকেটে রাজনীতির কোনো স্থান নেই, তাহলে অনেক ভুল বোঝাবুঝিই দূর হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো কৌশলী ও সংযত অবস্থান নেওয়া। আবেগী সিদ্ধান্তের চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা বেশি কার্যকর হতে পারে। আইসিসি, আয়োজক দেশ এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর সঙ্গে বসে নিরাপত্তা নিশ্চিতে লিখিত ও দৃশ্যমান আশ্বাস আদায় করা একটি বাস্তবসম্মত পথ। একই সঙ্গে জনমনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা স্বচ্ছ যোগাযোগের মাধ্যমে মোকাবিলা করা দরকার। ‘আইপিএল থেকে বিশ্বকাপ’-এই যাত্রাপথে একটি সিদ্ধান্ত কিভাবে দুই দেশের মধ্যে দূরত্বের অনুভূতি তৈরি করতে পারে, তারই উদাহরণ আমরা দেখছি। বাস্তব দূরত্ব কতটা, আর মানসিক দূরত্ব কতটা—সে হিসাব ভবিষ্যৎই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: রাজনীতি ও ক্রিকেটকে আলাদা রাখার দায়িত্ব শুধু একটি দেশের নয়; এটি পুরো ক্রিকেট বিশ্বের সম্মিলিত দায়িত্ব। অন্যথায়, ক্রিকেট আর আনন্দের উৎস থাকবে না; হয়ে উঠবে রাজনৈতিক সংঘাতের আরেকটি মঞ্চ।

লেখক : শিক্ষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ 

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  আইপিএল থেকে বিশ্বকাপ   এক সিদ্ধান্ত   দুই দেশের দূরত্ব  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close