কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন নৌরুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর কোনোটিরই নেই শতভাগ নিরাপত্তাব্যবস্থা। জাহাজগুলোতে রয়েছে একাধিক ত্রুটি। এসব ত্রুটির মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করছেন পর্যটকরা। এই নৌপথে শুরুতে জাহাজ চলাচল শুরু করেছিল ৮টি। একটিতে গত মাসে আগুন ধরার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরেকটি ফিটনেস না থাকার কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এখন চলমান রয়েছে ৬টি জাহাজ। তার মধ্যে ৩টি বড় আর ৩টি ছোট জাহাজ। এই ৬টি জাহাজেও রয়েছে নানা ত্রুটি। সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএ তা খতিয়ে বের করে। এ সময় ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রতিনিধিসহ বেশ কয়েকটি প্রশাসনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। এই ৬টি জাহাজে যা ত্রুটি পাওয়া গেছে তা নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জাহাজের ত্রুটি ঠিক করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কিন্তু এখনো হাজারো প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চলমান রয়েছে এই জাহাজগুলো। চলতি পর্যটন মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে এসব জাহাজ। চলাচলের অনুমতি পাওয়া প্রতিটি জাহাজেরই রয়েছে শর্তের লঙ্ঘন। আবার কোনো কোনোটির রয়েছে একাধিক নিরাপত্তা ত্রুটি।
সম্প্রতি সেন্টমার্টিনগামী একটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরই টনক নড়ে প্রশাসনের। ইতোমধ্যে চলতি মৌসুমে চলাচলের অনুমতি পাওয়া পর্যটকবাহী ৮টি জাহাজের মধ্যে এমভি এলসিটি কাজল ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। যার প্রেক্ষিতেই গত ৩০ ডিসেম্বর ভোররাতে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাটে পর্যটক যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে জাহাজগুলোতে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এতে জাহাজগুলোতে নানা ত্রুটি ও শর্তের লঙ্ঘন শনাক্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে কোস্টগার্ড নৌপরিবহন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিতভাবে প্রতিবেদন প্রদান করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো হল- এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি, এমভি কেয়ারি সিন্দাবাদ, এমভি বে-ক্রুজার, এমভি কেয়ারি ক্রুজ এন্ড ডাইন ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজ। উল্লেখ করা নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো হলো- জাহাজগুলোরও মিনিমাম সেফ ম্যানিং ডকুমেন্ট নেই এবং দুইজন মাস্টার ও দুইজন ড্রাইভার দ্বারা নৌযান পরিচালনার বিধান থাকলেও রয়েছে একজন করে; ফায়ার ও সেইফটি প্ল্যান অনুযায়ী এলএসএ ও এফএফএ নেই এবং বেশিরভাগ জাহাজে পর্যাপ্তসংখ্যক কার্যকরী লাইফ জ্যাকেট নেই; সার্ভে সার্টিফিকেটে প্রদত্ত মাস্টারের নামের সঙ্গে জাহাজে কর্মরত মাস্টারের নামে মিল নেই; মেইন ইঞ্জিনের ওভার হলিং ডকুমেন্ট নাই; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফায়ার পাম্প কার্যকরী অবস্থায় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ হোজপাইপ পাওয়া যায়নি; ইঞ্জিনরুমে ফিক্সড কার্বন ডাই-অক্সাইড সিস্টেম নেই; ফায়ার কন্ট্রোল প্যানেল, ফায়ার এলার্ম ও ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম কার্যকরী অবস্থায় পাওয়া যায়নি; জাহাজ পরিচালনাকারী মাস্টার ও ড্রাইভারগণের বেসিক ফায়ার ফাইটিং ট্রেনিং সার্টিফিকেট নেই।
গত ৩০ ডিসেম্বর ভোররাত সাড়ে ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত কোস্টগার্ড, জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ-এর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে জাহাজের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, রুট পারমিট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ক্রুদের দক্ষতা সনদ যাচাই করা হয়। অভিযান শেষে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে নানা ত্রুটি ধরা পড়ার বিষয়টি জানান সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজার (কস্তুরাঘাট) নদীবন্দর ও পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াকিল জানান, মোট জাহাজ ছিল ৮টি। একটিতে আগুন ধরার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আরেকটি ফিটনেস না থাকার কারণে বন্ধ করা হয়েছে। এখন জাহাজ চলাচল করছে ৬টি। পরিদর্শনকালে আমরা প্রায় সব জাহাজেই একটি সাধারণ ও গুরুতর ত্রুটি লক্ষ্য করেছি। জাহাজের সনদপত্র অনুযায়ী যে যোগ্য প্রথম শ্রেণির মাস্টার থাকার কথা, অনেক জাহাজেই তাকে পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার বা সহকারী মাস্টার দিয়েই জাহাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জাহাজ মালিক পক্ষ আমাদের আশ্বস্ত করেছিল যে দ্রুতই যোগ্য মূল মাস্টার সরবরাহ করা হবে, তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এখনো করা হয়নি। পরিদর্শনে ইঞ্জিন রুম সংক্রান্ত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি ধরা পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন ইঞ্জিনের প্রেসার ও কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করে মেইনটেনেন্স লগবুক সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও অধিকাংশ জাহাজেই এই লগবুক সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি।
এদিকে কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের আলোকেই সেন্টমার্টিন রুটে নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে গত ৪ জানুয়ারি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ারের অধিশাখার মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জাহাজগুলোর ত্রুটি ও বিচ্যুতিসমূহ সংশোধনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করা না হলে পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর চলাচলের অনুমতি বাতিল করা হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে মো. আব্দুল ওয়াকিল জানান, কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জারি করা প্রজ্ঞাপন দাপ্তরিকভাবে পাননি। তবে বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত হয়েছেন। যৌথ অভিযানে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষও জাহাজগুলোতে নিরাপত্তার ঝুঁকিসমূহ পর্যবেক্ষণে পেয়েছে। আর প্রজ্ঞাপনটি হাতে আসার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান নদীবন্দরের এ কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট সংলগ্ন বাঁকখালী নদীতে অবস্থানরত সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজ ‘দ্য আটলান্টিক ক্রুজ’-এ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এতে জাহাজের এক কর্মচারী নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার সময় জাহাজের ক্রুসহ ১৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
কেকে/এজে