গত বছরের উৎপাদিত লবণ মাঠে মজুত থাকায় এখনো অনেক লবণচাষি মাঠে নামেননি। পর্যাপ্ত লবণ মজুত থাকা সত্ত্বেও দেশের বাইরে থেকে লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের লবণচাষিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
লবণচাষিরা বলছেন, গত বছরের মজুত লবণ দিয়েই চলতি বছরের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ অবস্থায় লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া মানে দেশের লবণ শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।
এদিকে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২৪৭টি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত (ক্রুড) লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৪২৯ মেট্রিক টন করে লবণ আমদানি করতে পারবে। অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী, ঋণপত্র (এলসি) খোলার সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে লবণ আমদানি সম্পন্ন করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আমদানিকৃত অপরিশোধিত লবণ পরিশোধন করে ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করতে হবে এবং সে বিষয়ে বিসিককে প্রমাণ দিতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
গত মৌসুমে মাঠে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ থাকা এবং নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হলেও সরকার নতুন করে এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের আওতায় কক্সবাজারের ৭৭টি মিল মালিকসহ মোট ২৩১টি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাজারো প্রান্তিক লবণচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিসিক কক্সবাজার লবণ ইউনিটের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জাফর ইকবাল ভুঁইয়া জানান, গত মৌসুমে দেশে লবণের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল। চলতি মৌসুমে দেশের মোট লবণ চাহিদা ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন।
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ঘন কুয়াশাসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক এলাকায় লবণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সরকার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এতে স্থানীয় লবণ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলেও তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে বিসিক কক্সবাজারের সহকারী মহাব্যবস্থাপক রাসেল বড়ুয়া জানান, জাতীয় চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই সরকার গত ৩০ ডিসেম্বর লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে মহেশখালীর লবণচাষি ও ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন বলেন, “এই মুহূর্তে লবণ আমদানির কোনো যৌক্তিকতা নেই। নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং মাঠে গত বছরের বিপুল পরিমাণ লবণ মজুদ রয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “চাষিরা এক কেজি লবণ বিক্রি করছেন মাত্র ৫ টাকায়, অথচ বাজারে সেই লবণ কিনতে হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। এ বৈষম্যের জন্য দায়ী কারা?”
লবণচাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের সদস্য-সচিব মোহাম্মদ আতাউর রহমান জানান, গত মৌসুমে বাজারদর কম থাকায় বিক্রি না হওয়া লাখ লাখ টন লবণ এখনো মাঠে পড়ে আছে। এই অবস্থায় নতুন করে আমদানি শুরু হলে চাষি ও ব্যবসায়ী পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়বে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুর বলেন, “এই মুহূর্তে লবণ আমদানি করা মানে লবণচাষিদের হত্যা করার শামিল। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।”
আমদানির সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহার না করা হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লবণচাষিরা কঠোর আন্দোলনে নামবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/এলএ