সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক ও দেশের অন্যতম সফল ওপেনার তামিম ইকবালকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার বিষয়ে বিসিবির সিদ্ধান্ত নিয়ে তামিমের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি ফেসবুকে কড়া ভাষায় পোস্ট দেন।
বর্তমানে বিসিবির অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা নাজমুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার তামিমের বক্তব্যসংবলিত একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে ফেসবুকে লেখেন, ‘এবার আরও একজন পরীক্ষিত ভারতীয় দালালের আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দুচোখ ভরে দেখল।’
পোস্টটি কিছু সময় তার টাইমলাইনে থাকলেও তীব্র সমালোচনার মুখে গভীর রাতে তা সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এমন বিতর্কিত মন্তব্য করায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বোর্ড।
এর আগে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তামিম ইকবাল ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে হঠাৎ মন্তব্য না করে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তামিম বলেন, ‘আমি বোর্ডে থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতাম। অনেক বিষয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যায়।’ তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে ওঠা আলোচনার জবাবেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন তামিম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা উচিত। সরকার বড় অংশীদার হলেও বোর্ডের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, আজকের সিদ্ধান্তের প্রভাব আগামী ১০ বছর পর কী হবে সেটাও বিবেচনায় রাখা জরুরি, বিশেষ করে যখন বোর্ডের বড় একটি আয়ের উৎস আইসিসি।
তামিমের এই বক্তব্যগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিসিবি পরিচালক নাজমুল ইসলামের মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর বিসিবির নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে পরিচালক নির্বাচিত হন নাজমুল ইসলাম। ওই নির্বাচন ঘিরেও অনিয়ম ও সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে তামিম ইকবালসহ একাধিক প্রার্থী তখন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
ওই মন্তব্য ঘিরে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক জাতীয় দলের ক্রিকেটার প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
জাতীয় দলের পেসার তাসকিন আহমেদ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লেখেন, ‘ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রাণ।
সেই ক্রিকেটে বড় অবদান রাখা সাবেক জাতীয় অধিনায়ককে ঘিরে সম্প্রতি এক মন্তব্য অনেককেই ভাবিয়েছে। দেশের একজন সাবেক ক্রিকেটারকে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের বক্তব্য দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সহায়ক নয় বলেই মনে করি। আশা করি, সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল অবস্থান নেবে।’
এদিকে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার রুবেল হোসেন আরও কড়া ভাষায় নিজের অবস্থান জানান। তিনি লেখেন, ‘নাজমুল ইসলাম সাহেব, দ্বিমত পোষণ ও সমালোচনা করা আপনার অধিকার। কিন্তু আপনি যে দায়িত্বশীল একটি চেয়ারে বসে আছেন, সেটা মনে না রেখেই এমন মন্তব্য করছেন। একজন বর্তমান ও সাবেক সিনিয়র ক্রিকেটারকে আপনি ‘ভারতীয় দালাল’ তকমা দিলে তার প্রভাব দেশের মানুষের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপভাবে উপস্থাপন করলেন। এত বড় জায়গায় বসে কোথায়, কীভাবে কথা বলতে হয় এই বেসিক সেন্সটুকু আপনার থাকা দরকার। দিস ইজ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আপনার চেয়ারের ওজন আপনি বোঝেন না বলেই এমন আচরণ করেছেন।’
একই সুরে জাতীয় দলের অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনও তামিমের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রাণ। সেই ক্রিকেটে বড় অবদান রাখা সাবেক জাতীয় অধিনায়ক কে ঘিরে সম্প্রতি এক মন্তব্য অনেককেই ভাবিয়েছে।
দেশের একজন সাবেক ক্রিকেটারকে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের বক্তব্য দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সহায়ক নয় বলেই মনে করি। আশা করি, সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল অবস্থান নেবে।’
মুমিনুল হক ফেসবুক বার্তায় জানান, ‘সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের মন্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং দেশের ক্রিকেট সমাজের প্রতি অপমানজনক। একজন ক্রিকেটারের প্রতি এমন আচরণ বোর্ডের দায়িত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে ন্যূনতম সম্মানও দেওয়া হয়নি; বরং তাকে জনসম্মুখে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছে। এত বড় দায়িত্বে বসে কোথায় এবং কীভাবে কথা বলতে হয়, তার বেসিক শিষ্টাচারও এ ধরনের মন্তব্যে দেখা যায়নি। আমি এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া ও তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি। বিসিবিকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
এদিকে জাতীয় দলের আরেক ক্রিকেটার তাইজুল ইসলাম বিসিবি পরিচালকের বক্তব্যকে সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বক্তব্যে আমি হতবাক। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার সম্পর্কে বোর্ড পরিচালকের এমন শব্দচয়ন শুধু কুটিনয় নয়, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির পরিপন্থি।’
ক্রিকেটারদের এমন প্রকাশ্য প্রতিবাদে বিষয়টি এখন ক্রিকেট বোর্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে জনআলোচনায় পরিণত হয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশও বিসিবির ওই পরিচালকের মন্তব্যকে ‘অশোভন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে সিলেটে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। ওই মন্তব্যের জন্য নাজমুলকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াসহ তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে ক্রিকেটারদের এই সংগঠনের পক্ষ থেকে।
এদিকে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘যদি আমি শব্দটা ইংরেজিতে বলতাম, হয়তো এভাবে হতো না। আমি নিজেও একজন দালাল, পার্থক্য শুধু এটুকুই যে আমি বাংলাদেশের দালালি করছি। বাংলায় শব্দটা শোনার সময় একটু খারাপ লাগে।’
তামিমের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘এখানে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি দেশের মানুষের অনুভূতিই প্রতিফলিত করেছি।’
উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর বিসিবির নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে পরিচালক নির্বাচিত হন নাজমুল ইসলাম। ওই নির্বাচন ঘিরেও অনিয়ম ও সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে তামিম ইকবালসহ একাধিক প্রার্থী তখন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
কেকে/ এমএস