আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে ভোটের মাঠের রাজনীতিতে বিভিন্ন কৌশলে কাজ করছে জামায়াতে ইসলামী। সুপরিকল্পিত ও বহুমাত্রিক কৌশলে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে দলটি। ইতোমধ্যে এসব কৌশলের প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ধর্মীয় আস্থা, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা, নারীকেন্দ্রিক দাওয়াতি কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে জামায়াত ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী ‘ভোটব্যাংক’ গড়ে তুলছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের আধিপত্য এবং বিজয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ফলে ছাত্ররাজনীতিতে এই সাফল্যের প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে না; এটা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সুতরাং, এই বিষয়টিও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
‘ওয়ান বক্স’ কৌশল ও ইনক্লুসিভ প্রার্থী নির্বাচন : ইসলামি দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভাজন কাটিয়ে এবার ‘ওয়ান বক্স’ নীতিতে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ইসলামি ও সমমনা বিভিন্ন দলের ভোট একত্র করার লক্ষ্যে আসনভিত্তিক সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই তারা আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন। যার চূড়ান্ত ফল খুব শিগগিরই দেখা যাবে।
এ ছাড়া এই কৌশলের অংশ হিসেবে প্রার্থী নির্বাচনে ‘ইনক্লুসিভ’ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। দলীয় কাঠামোর বাইরের বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, এমনকি অমুসলিমদেরও প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এই উদ্যোগ জামায়াতকে একটি সংকীর্ণ দলীয় গণ্ডির বাইরে এনে ভিন্নমাত্রিক বার্তা দিতে সহায়ক হতে পারে।
ইস্যুভিত্তিক অনলাইন প্রচারে সরব উপস্থিতি : রাজনৈতিক প্রচারণায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বর্তমানে অনেকটাই এগিয়ে। ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে নিয়মিত ইস্যুভিত্তিক প্রচার চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া বিতর্কিত ভিডিও এবং পাল্টা বয়ান তৈরিতে দলটি সরব রয়েছে। যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল মাধ্যম এখন রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। যেখানে অনেক দল এখনো মাঠকেন্দ্রিক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ, সেখানে জামায়াত প্রযুক্তিকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভোটের হিসাব মেলাতে ভোটার স্থানান্তর : নির্বাচনকে সামনে রেখে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার এলাকা স্থানান্তর হয়েছে। ইসির জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের সূত্রমতে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মোট আবেদন হয় ৭ লাখ ১ হাজার ৩৩৭টি, যা আগের যে কোনো বছরের তুলনায় বেশি। অঞ্চলভিত্তিক স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ইসির ১০টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে চট্টগ্রাম। এ বিভাগে সর্বোচ্চ এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৪৩ জন ভোটার স্থানান্তরের আবেদন করেছেন। এরপরে রয়েছে ঢাকা যেখানে ৮৬ হাজার ৮২৫ জন আবেদন করেছেন। খুলনায় আবেদন করেছেন ৮১ হাজার ৭২৫ জন। ময়মনসিংহে আবেদন করেছেন ৭৮ হাজার ৮০৫ জন। রাজশাহীতে আবেদন করেছেন ৭২ হাজার ৮১৫ জন। রংপুরে আবেদন করেছেন ৬৩ হাজার ৮৯৭ জন। বরিশালে আবেদন করেছেন ৮৫ হাজার ৭২০ জন। ফরিদপুরে আবেদন করেছেন ৩৯ হাজার ৯৫ জন। সিলেটে আবেদন করেছেন ২৭ হাজার ৫৭৬ জন।
ইসির পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে ভোটার স্থানান্তরের সংখ্যা ২১ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে, ২০২৪ সালে ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯১৭ জন। ২০২৩ সালে ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন ৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৫১ জন। ২০২২ সালে (হালনাগাদ বছর) ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন ৭ লাখ ১৭ হাজার ২০৮ জন। ২০২১ সালে ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৪ জন।
একটি সূত্রের দাবি এই স্থানান্তর হওয়া ভোটারের বড় একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক, যারা ভোটের হিসাব মেলাতেই এলাকা পরিবর্তন করেছেন।
মসজিদকেন্দ্রিক বয়ান ও ধর্মীয় প্রভাব : জামায়াতে ইসলামীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো মসজিদকেন্দ্রিক সামাজিক প্রভাব বিস্তার। দেশের বিভিন্ন এলাকার ইমাম-খতিব ও ধর্মীয় বক্তাদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বয়ান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমন অভিযোগ রয়েছে।
শুক্রবারের খুতবা, ওয়াজ মাহফিল কিংবা ধর্মীয় আলোচনায় সরাসরি ভোট চাওয়ার বদলে রাজনৈতিক মনোভাব তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে। একাধিক মুসল্লি জানান, ধর্মীয় পরিবেশে রাজনৈতিক বয়ান উপস্থাপন করলে সাধারণ মানুষ সহজেই তা বিশ্বাস করে ফেলে। তবে বিপরীত মতও আছে, অনেকে মনে করেন রাজনীতি ধর্মের বাইরে নয়, ফলে ধর্মীয় আলোচনায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আসা স্বাভাবিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল সরাসরি প্রচারের চেয়ে বেশি কার্যকর। কারণ ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্য মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে প্রতিফলিত হয়।
অন্যদিকে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা জামায়াতের আরেকটি বড় কৌশল। বৃত্তি, শিক্ষা সহায়তা, বই প্রদান, স্কুল ফি সহায়তা থেকে শুরু করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও সহায়তা করছে জামায়াতপন্থি সংগঠনগুলো। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির। এ ছাড়াও নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য নিয়মিত আর্থিক অনুদান ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দলটি একটি কৃতজ্ঞ ও সহানুভূতিশীল ভোটারগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।
নারীকেন্দ্রিক দাওয়াতি কার্যক্রম : প্রান্তিক এলাকায় নারী কর্মীদের মাধ্যমে দাওয়াতি কার্যক্রমও জোরদার করেছে জামায়াত। ধর্মীয় তালিম, মহিলাদের মিলনমেলা ও বয়ানের মাধ্যমে নারীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অনেক নারী অংশগ্রহণকারী এটিকে স্বাভাবিক ধর্মীয় কার্যক্রম হিসেবে দেখলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ভোটার টানার একটি সূক্ষ্ম কৌশল।
এদিকে গণভোট নিয়েও সোচ্চার রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান বলে মন্তব্য করেছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। দল-মত নির্বিশেষে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তিনি সবাইকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এ আহ্বান জানান।
দেশবাসীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। গণভোট মানে জনগণের সরাসরি মতামত, গণভোট মানে জনগণ নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র। এই গণভোটের মাধ্যমে আমরা অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিপরীতে ন্যায়, ইনসাফ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়া, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ নিশ্চিত করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসুন, দল-মত নির্বিশেষে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সবাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করি। আপনার একটি ভোটই হতে পারে সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রধান হাতিয়ার।’
কেকে/ এমএস