প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ছিল লাখো চাকরিপ্রার্থীর জন্য জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। অথচ সেই দিনটিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া, ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ জালিয়াতি। এবং সারা দেশে শতাধিক চক্র সদস্য ও পরীক্ষার্থী গ্রেপ্তারের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
১৪ হাজারের বেশি পদের এই বিশাল নিয়োগের প্রশ্নপত্র পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। যেসব তরুণ বছরের পর বছর ধরে মেধা ও শ্রম দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন, যাদের কাছে এই চাকরি ছিল পরিবার বাঁচানোর শেষ আশ্রয় তাদের স্বপ্ন এদিন নির্মমভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
যখন প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধে ঘুরে বেড়ায়, তখন মেধা নয়, বরং প্রতারণাই হয়ে ওঠে যোগ্যতার মানদণ্ড। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে বিদ্যমান নিয়োগ ব্যবস্থা কার্যত নষ্ট হয়ে গেছে। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যন্ত দুর্নীতির জাল এতটাই বিস্তৃত যে সৎ ও মেধাবীদের জন্য সেখানে জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। একের পর এক পরীক্ষা আয়োজন করে যদি একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে সেটি নিয়োগ নয়, বরং চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তামাশা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এত তাড়াহুড়ো করে এক ধাপে পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনই বা কী ছিল? যেখানে পূর্বে ধাপে ধাপে তুলনামূলক সুশৃঙ্খলভাবে পরীক্ষা আয়োজন করা হতো, সেখানে হঠাৎ করে এক ধাপে পরীক্ষা নিয়ে কেন দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ানো হলো কেন? এই সিদ্ধান্তে কারা লাভবান হলো, কারা প্রশ্নফাঁসের সুযোগ পেল সে বিষয়ে দায়ী মহলকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।
একটি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় যদি প্রশ্নফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, ডিজিটাল ডিভাইস, শিক্ষকদের অনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক প্রভাব এত সহজে কাজ করতে পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্রে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে কথা বলা নিছক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। এতদিন পর্দার আড়ালে কী পরিমাণ জালিয়াতি হয়েছে, তা ভাবলেই সৎ পরীক্ষার্থীদের আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। এই ঘটনার দায় রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিতে হবে। বছরের পর বছর রক্ত ঘাম ঝরানো পরিশ্রম যদি শেষ পর্যন্ত প্রতারকদের পকেটে যায়, তাহলে তরুণ সমাজের হতাশা একসময় বিস্ফোরক রূপ নিতেই পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও প্রশ্নফাঁস বন্ধ হয়নি, নিয়োগবাণিজ্যও থামেনি। যে সরকার সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে, তাদের কাছ থেকে আরও সাহসী ও কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা ছিল। প্রশ্নফাঁসের দায় এড়ানোর একমাত্র পথ হলো এই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করা এবং সম্পূর্ণ সংস্কারকৃত, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় নতুন করে পরীক্ষা আয়োজন করা। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি ও চক্রকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রশ্ন ফাঁসের সাহস না করে।
কেকে/ এমএস