ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী মাসের ১২ তারিখ অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সব প্রস্ততি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২২ জানুয়ারি শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। প্রচারণার জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ভোটের মাঠে দলকে বিজয়ী করতে নিচ্ছে বহুমাত্রিক কৌশল। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎপরতা অনেকে বেশি লক্ষণীয়। তবে এখনো ভোটের মাঠে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফলে ভোটের রাজনীতিতে এখনো অনেকেটা পিছিয়ে আছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের মাঠে বিএনপির কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে ‘অতি আত্মবিশ্বাস’। যা তাদের ভোটযুদ্ধে পিছিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শক্তিশালী কোনো দল নেই। যদিও তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ, জামায়াতে ইসলামী বিগত সময়ে দেশের রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ না পেলেও; তারা সেই সময়টাজুড়ে সাংগঠনিক শক্তি অর্জনে কাজ করেছে। তৈরি করেছে জনমত ও ভোটব্যাংক।
এ ছাড়া হাসিনা সরকারের পতনের প্রকাশ্য ধারাবাহিক কল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছে জামায়াত। যা জনমনে অনেকটা প্রভাব ও দলটি সম্পর্কে সুধারণা তৈরি করেছে। অন্যদিকে বিএনপির কিছু কর্মকাণ্ডে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। যা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দলটির নেতাকর্মীরা।
তাদের ভাষ্য, তরুণ ভোটারদের নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার পরিকল্পনা রয়েছে জানালেও তা এখনো দৃশ্যমান নয়। যার ফলে দেশের বৃহৎ এ তরুণ শক্তি অনেকটা জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের প্রতি ঝুঁকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অন্য দলগুলো নানা কৌশলে ‘ডোর টু ডোর’ ভোটের প্রচারণা চালিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে আছে বিএনপির প্রার্থীরা। এমনকি এখনো দলটির অভ্যন্তরে চলছে নানা গ্রুপিং। বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে দলের নেতারা। যা সরাসরি ভোটের মাঠে অন্য দলের প্রার্থীদের জয়ী হতে সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে।
যদিও কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আগামী জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির এককভাবে সরকার গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা জয়ী হব। আমরা জোরালোভাবে বিশ্বাস করি যে এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থায় আমরা রয়েছি।’
তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে যত সহজ ভাবা হচ্ছে, নির্বাচন তত সহজ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তারেক রহমান। বিএনপির শীর্ষ এই নেতা বলেন, ‘এক বছর, সোয়া বছর আগে যে কথাটি বলেছিলাম যে সামনের নির্বাচন যা ভাবছেন তা নয়। আজকে আস্তে আস্তে আমার কথাটা প্রমাণিত হচ্ছে। এখনো যদি আমরা সিরিয়াস না হই, সামনে এ দেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। এটা একমাত্র বাঁচাতে পারে গণতন্ত্র এবং সেই গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করতে পারেন আপনারা-বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রত্যেকটি মানুষ।’
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, বিএনপির পরিকল্পনাগুলো জানাতে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যেতে হবে। তাহলে নিশ্চয়ই মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দেবে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলীয় সরকার হবে না। যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, তাদের পাশাপাশি যারা ভোট দেননি, তাদের জন্যও কাজ করতে হবে। নির্দিষ্ট কারও জন্য কাজ করা যাবে না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি স্বপ্ন দেখাচ্ছে না, বিএনপি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে। নির্বাচনের বেশি সময় নেই। দল যার হাতে ধানের শীষ দিয়েছে, তাদের পক্ষে থাকতে হবে। প্রার্থী আসবে, প্রার্থী পরিবর্তন হবে, তবে দল ও আদর্শ রয়ে যাবে।
অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মিথ্যা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে দাবি করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের মিথ্যা বলার দরকার নেই। বাস্তবভিত্তিক যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটা জনগণের কাছে পৌঁছে দিলেই হবে। এ কাজ করা কঠিন। তবে সবাই মিলে চেষ্টা করলে সেটি করা সম্ভব হবে।
উপস্থিত বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় দেখলাম, কিছু ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে তাদের কথা বলছেন। তারা যদি বলতে পারেন, আপনি কেন বলতে পারবেন না? বললে সবাই বলবেন, না বললে কেউ বলতে পারবেন না। আপনি আপনার এলাকায় সেভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। বললে সবার বলার অধিকার আছে। আর যদি কোথাও নিয়ম হয়ে থাকে, বলবেন না। তাহলে সেই নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। কোনো বিশেষ কারও জন্য হবে আর কারও জন্য হবে না, এটা তো হতে পারে না।’
কেকে/ এমএস