মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
মবের তাণ্ডবে আবারও ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৫৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বৈষম্য বিলোপের পাশাপাশি বিচারহীনতা থেকে মুক্তি পাবে বাংলাদেশ। সমুন্নত হবে নাগরিক অধিকার। আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে স্থিতিশীল হবে জনজীবন। কিন্তু এই আকাঙ্খার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মবতন্ত্র’। এই মবের হাত ধরেই বাংলাদেশে ফিরছে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্যে দিয়ে অবসান ঘটে দলটির ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নতুন করে স্বপ্ন দেখেছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ফিকে হতে শুরু করেছে। সেই বিচারহীনতা, কোনো অভিযোগ এনে ব্যক্তি বিশেষকে হেনস্তা, প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ-নৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মব থেকে রেহাই পায়নি গণমাধ্যমও। শিক্ষক, চিকিৎসক থেকে শুরু করে অনেকেই।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে শিক্ষক হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। যা দেশজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া গতকাল রাজধানীর সিএমএম আদালাতে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের প্রিজনভ্যানে ডিম নিক্ষেপ করেছে ইনকিলাব মঞ্চের সমর্থকরা। এর আগে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুকে ঘিরে দুইটি গণমাধ্যম ও ছায়ানট এবং উদীচীর ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিরোধী মত দমনে সরকার ছিল কঠোরহস্ত। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে করা হতো হেনস্তা, পুরে দেওয়া হতো জেলে। কিন্তু সেই সংস্কৃতিই যেন মবের মাধ্যমে ফিরছে। তারা বলছেন, কেউ যদি অপরাধী হয়ে থাকে, বিগত স্বৈরাচারের দোসর হয়ে থাকে, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু মব সৃষ্টি করে হেনস্তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিচার প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে। মবের সংস্কৃতি দেশকে দীর্ঘ মেয়াদে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাবে।

পলকের প্রিজনভ্যানে ডিম নিক্ষেপ:  ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার শুনানিতে এসে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে বহনকারী প্রিজনভ্যানে ডিম নিক্ষেপ করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা ‘লীগ ধর, জেলে ভর’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনে ঢাকার মধ্য বাড্ডায় দুর্জয় আহম্মেদ হত্যাচেষ্টা মামলায় পলককে গ্রেপ্তার দেখাতে গত ২৪ ডিসেম্বর আবেদন করেন বাড্ডা থানার এসআই গোলাম কিবরিয়া খান। আদালত তার উপস্থিতিতে শুনানির জন্য ৭ জানুয়ারি দিন রেখেছিলেন। তবে ওইদিন পলককে আদালতে হাজির করা হয়নি। এজন্য সোমবার নতুন দিন ঠিক করা হয়েছিল। এদিন শুনানিকালে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম আরিফুর রহমান শুনানি নিয়ে পলককে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এরপর সাবেক প্রতিমন্ত্রীকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।

অন্যদিকে এদিনই ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জশিতা ইসলামের আদালতে হাদি হত্যা মামলার শুনানির দিন ছিল। মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের আদালতে হাজির হন। অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিনের সময় চান তিনি। আদালত সময় আবেদন মঞ্জুর করে বৃহস্পতিবার অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ঠিক করেন। ‎এদিন হাদির ভাই ওমর হাদিও আদালতে আসেন।

শুনানি শেষে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা সিএমএম আদালতের সামনে ছিলেন। তারা জানতে পারেন, পলককে আদালতে হাজির করা হয়েছে। দুপুর দেড়টার দিকে পলককে নিয়ে একটি প্রিজনভ্যান কাশিমপুর কারাগারের উদ্দেশে আদালতের হাজতখানা থেকে বের হয়। সিএমএম আদালতের সামনে গাড়িটি এলে ডিম নিক্ষেপ করেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা। এসময় তাদের বিভিন্ন স্লোগান দিতেও দেখা যায়। এ অবস্থায় পলককে নিয়ে প্রিজনভ্যানটি কাশিমপুরের দিকে চলে যায়।

এর আগে গত শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা এক শিক্ষককে শারীরিক হেনস্তার পর টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদিন দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে চাকসুর চার নেতার নেতৃত্বে ওই শিক্ষককে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ সময় শিক্ষকের মোবাইল ফোনেও তল্লাশি চালানো হয়। হেনস্তার শিকার ওই শিক্ষকের নাম হাসান মোহাম্মদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ক্যাম্পাসে তিনি আওয়ামী ও বামপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের একাংশের সঙ্গে যুক্ত।

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একজনকে পেছন থেকে তাকে চেপে ধরতে দেখা যায়। সেখানে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। ওই অবস্থায় তাকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত ১১ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে হেনস্তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের)। একপর্যায়ে অধ্যাপক জামাল উদ্দীন দৌড়ে পালাতে গেলে তাকে ধাওয়া করেন এ বি জুবায়ের। পরে অবশ্য ওই শিক্ষক একটি গাড়িতে করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

বেলা দুইটার দিকে এ ঘটনার পর এ বি জুবায়ের এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ পাঁচজন শিক্ষক ক্যাম্পাসে গোপন বৈঠকে যুক্ত হয়েছিলেন। খবর পেয়ে তাদের পাকড়াও করে পুলিশে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা। তবে আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা গাড়িতে তারা পালিয়ে গেছেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, আ ক ম জামাল উদ্দীনসহ আওয়ামী লীগপন্থি কয়েকজন শিক্ষক সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে এসেছিলেন। খবর পেয়ে কিছু শিক্ষার্থী ওই ভবনের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়েরের নেতৃত্বে আ ক ম জামাল উদ্দীনকে ধাওয়া দেওয়া হয়।

শিক্ষক হেনস্তা করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। এক বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই আইনানুগ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। এর একমাত্র পথ হচ্ছে আইন ও প্রশাসনিক তদন্ত। কোনোভাবেই ‘মব জাস্টিস’ গ্রহণযোগ্য নয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এর আগেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষার পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। গত তিন থেকে চার মাসে ক্যাম্পাসগুলোতে মব সংস্কৃতি ও শিক্ষক নিপীড়নের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়াকে উদ্বেগজনক বলেও উল্লেখ করা হয়।

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  মব   তাণ্ডব   ফ্যাসিবাদ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close