মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে ত্রিমুখী সংঘাতের জেরে টেকনাফ সীমান্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। বোমা, গুলি, স্থলমাইন বিস্ফোরণ এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ এ উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়েছে।
কক্সবাজারে ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা আসার পর সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের হাজারো মানুষ অনিশ্চয়তায় দিন যাপন করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদ্রোহী গ্রুপের আনাগোনা ও অপহরণ ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ ঘটছে। মিয়ানমার আর্মিরা বাংলাদেশ লক্ষ্য করে গুলি ছুটছে। আবার অনেক সময় তারা সীমান্তে প্রবেশ করে বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে মানুষিক ও শারিরিক নির্যাতন করছে। যার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সবকিছু মিলিয়ে টেকনাফ সীমান্ত এলাকা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
এদিকে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা এক ধরনের অবৈধ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করছে স্থানীয়রা। সেখানে কেউ যেন না যেতে পারে এমন আচারণ করা হচ্ছে। তারা মনে করছে, সীমান্ত এলাকায় যদি কেউ না যায় তাহলে চোরাকারবারিরা নিরাপদে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য ট্রলারে করে মিয়ানমারে নিয়ে যেতে পারে। আর এদের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশ কিছু মানুষের আঁতাত রয়েছে।
সম্প্রতি সেন্টমার্টিনে গেলে জানা যায়, সেন্টমার্টিনের নামে কোনো পণ্য আনা হলে সেই পণ্য সেন্টমার্টিনে না গিয়ে মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সীমান্ত এলাকা এক ধরনের অবৈধ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে কাজ চলছে। এ কাজে কোন ধরনের বাঁধা নেই বলেও খবর রয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সম্প্রতি শুরু হওয়া গোলাগুলি ও মর্টার শেল বিস্ফোরণের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায়। রোববার ভোরে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে ১২ বছর বয়সি হুজাইফা নুসরাত আফনান নামের একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে। শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-এ চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন জানান, শিশুটি লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টায় তিনি বলেন, ‘রোববার রাতে শিশুটির অপারেশন করা হয়েছে। তবে, মাথায় লাগা গুলি বের করা যায়নি। গুলি এমন এক জায়গায় স্থিত যে বের করলে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে।’ শিশুটিকে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। আশার কথা হলো, গতকাল থেকে আজ তার শারীরিক অবস্থায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
এছাড়া গতকাল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্তবর্তী শাহাজাহন দ্বীপে এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে স্থানীয় মোহাম্মদ হানিফ (২২) নামে একজনে পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গুরুতর আহত হন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হোয়াইক্যং নাফ নদীর সীমানায় এই ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন আহত মো. হানিফের বড় ভাই নুর আহমেদ। তিনি জানান, সোমবার সকালে হানিফ শাহাজাহানের দ্বীপ ও হাউসরদ্বীপ মধ্যবর্তী এলাকায় চিংড়ি ঘেরে কাজ করতে গেলে ঘেরের বাঁধে পুঁতে রাখা একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এতে তার দুই পায়ে মারাত্মক আঘাত লাগে। বিস্ফোরণে বাম পায়ের গোড়ালি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়েও গুরুতর জখম হয়। গতকাল আরাকান আর্মির সদস্যরা এপারে এসে স্থল মাইন পুঁতে রাখে। যার ফলে আমরা যারা চিংড়ি ঘেরে মাছ ধরি তাদের জন্য অনেক ঝুঁকি রয়েছে। সীমান্তে পুতে রাখা মাইনগুলো শনাক্ত করা হোক না হলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে।
প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার মশাল মিছিল
টেকনাফ সীমান্তে চলমান অস্থিরতা, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে শিশু আফনানের আহত হওয়া এবং সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হানিফের আহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে হোয়াইক্যং বাজার থেকে ছাত্রজনতার উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মশাল মিছিল বের করা হয়। সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে শুরু হওয়া এই মশাল মিছিলে স্থানীয় সচেতন মহলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও ছাত্রজনতা অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি হোয়াইক্যং বাজারের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সীমান্তে সহিংসতা বন্ধ, নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসা ও সুরক্ষার দাবিতে বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা।
স্থানীয়রা জানান, এপারের বাড়ি-ঘর কেঁপে ওঠে এবং ছোড়া গুলি চিংড়ি ঘের ও চাষের জমিতেও পড়ে। নারী ও শিশুরা ভয়ে কাঁদছে, রাতেও ও দিনের বেলায় বাসিন্দারা বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সারারাত আমরা জেগে ছিলাম, একেকটি বিস্ফোরণে বাড়িঘর কেঁপে উঠছিল। নারী ও শিশুরা ভয়ে কাঁদছিল।’
আরেক বাসিন্দা মো. ছৈয়দ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ, এপারের সাধারণ মানুষ অনিরাপদ মনে করছেন। হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু জানান, “গত তিনদিন ধরে সীমান্তে দিনে-রাতে গোলাগুলি ও বোমার বিস্ফোরণ চলছে। ছোড়া গুলি এপারে এসে পড়ছে, মানুষের চিংড়ি ঘরে ও চাষের জমিতে ক্ষতি হচ্ছে। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা আরমান বলেন, ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হচ্ছে। আমি নিরাপদে পালিয়ে আসছি।’
উখিয়া ব্যাটালিয়ন ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির বিষয়টি আমরা জানি।’
এ বিষয়ে হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই খোকন কান্তি রুদ্র খোলা কাগজকে জানান, ‘স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর আসে, সোমবার সকালে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্তের চিংড়ি ঘেরে পুঁতে রাখা একটি মাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ নামে এক যুবক আহত হন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। গত চার দিন ধরে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছিল।’
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার নাফ নদীতে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে গেলে ওপারের ছোড়া গুলিতে আহত হন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বালুখালী গ্রামের মৃত ছৈয়দ বলির ছেলে মো. আলমগীর। শনিবার সকাল পর্যন্ত টানা কয়েক দিন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের হোয়াইক্যং সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গোলাগুলি ও বিস্ফোরণ চলেছে। মাঝে কিছু সময় থামলেও আবার শুরু হচ্ছে ভারী অস্ত্রের ব্যবহার, যা সীমান্তের এপারের মানুষকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।
গত রোববার হোয়াইক্যংয়ের সীমান্তবর্তী তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় বাড়ির উঠানে খেলার সময় মায়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে শুরুর আহত হন ১১ বছর বয়সি হুজাইফা নুসরাত আফনান, বর্তমানে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিউতে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক বলছেন হুজাইফার অবস্থা আশংঙ্কাজনক। সোমবার বেলা ১১টার দিকে গুলিবিদ্ধ হুজাইফা আফনান আহতের ঘটনায় টেকনাফের হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ হাইওয়ে সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মানববন্ধন চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্বিচারে গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা এবং অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধের দাবি জানান।
কেকে/ আরআই