সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭ জন      একদিনের সফরে বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী      রাজধানীতে জলাবদ্ধতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:২০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিশ্বাসযোগ্যতা ও অন্তর্ভুক্তির সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক-বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক চাপ মিলিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নির্বাচন ও পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র নিয়ে দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষা বা বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি, সাইবার ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা করছেন বিশিষ্টজনরা।

গতকাল সোমবার সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা : গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন।

সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন একটি নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির ঘাটতি এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিজেরাই পুরোপুরি নিরাপদ নন, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে জড়িত।

জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ডেভিল হান্ট’ ধরনের প্রবণতা এবং সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার পরও সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা কমেনি। নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়; এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নির্বাচনকালীন ও পরবর্তী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও জড়িত।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, মানব পাচার, রোহিঙ্গা সংকট, ভারত-চীন ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সাইবার যুদ্ধ এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য বড় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন এখন আর শুধু ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা নয়; এটি একটি হাইব্রিড নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, যেখানে ডিজিটাল ঝুঁকি ও অপপ্রচার বড় উদ্বেগ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও জনগণ কতটা প্রস্তুত- তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। আগামী প্রজন্মকে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পুলিশের ক্ষেত্রে এফআইআর সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যাজনক চর্চা বন্ধ করা জরুরি।

ড. এম. এনামুল হক বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এর মধ্যে বিচার ব্যবস্থা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব বোর্ড এবং পরিবহন খাতসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র এতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। আসন্ন নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন জ্ঞান ও সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক দল, অংশীজন ও জনগণের ঐক্য অপরিহার্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই অনেক সময় শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী রূপ নেয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে ২০২২ সাল থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট হয়েছে, যার ফলে বিশ্ব আজ অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, এসব বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা এখন একটি প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও সরকার মব সহিংসতার কাছে নতিস্বীকার করছে, ফলে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র দুর্বল হচ্ছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদ ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন নির্বাচনকে পক্ষপাতদুষ্ট ও অবিশ্বাসযোগ্য উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ও কার্যকর আচরণবিধি ছাড়া জনআস্থা ফিরবে না।

অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও ড. মোশতাক হোসেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের সমালোচনা করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর ও মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন নন-ট্র্যাডিশনাল নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, শিক্ষা সংস্কার ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেন। অনেক বক্তা জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন ও পুলিশ কাউন্সিল গঠনের দাবি জানান।

অন্যদিকে, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী ও মনিরুল ইসলাম আকন্দ সাইবার নিরাপত্তা, খাদ্য-পানি সংকট এবং আইনের অসম প্রয়োগকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারা বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা সংকট কেবল সীমান্ত বা বাহিনীকেন্দ্রিক নয়; এটি মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রোহিঙ্গা সংকট, সাইবার ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও ভয়মুক্ত নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত না হলে দেশ গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে। তাদের সতর্কবার্তা- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যর্থ হলে তা শুধু গণতন্ত্র নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  নির্বাচন   গৃহযুদ্ধ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close