ভারতের স্বার্থ রক্ষায় যেন আরও এক ধাপ এগোল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। তাদের নিরাপত্তা বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-কে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, দলে মোস্তাফিজুর রহমান থাকলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া আরও দুইটি অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছে তারা। নিরাপত্তা শঙ্কার কথা সামনে এনে যে প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি, সেটিকে অনেকেই দেখছেন ক্রিকেটীয় ন্যায্যতা ও সমতার পরিপন্থি এক ‘উদ্ভট উদ্যোগ’ হিসেবে। ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো বিষয়টির কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের মান রক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে অন্য অংশগ্রহণকারী দলের উদ্বেগ ও আপত্তিকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে।
আইসিসিকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের ম্যাচ ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথমত, বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে মোস্তাফিজুর রহমান অন্তর্ভুক্ত থাকলে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে- এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ‘মুস্তাফিজ ইস্যু’কে সামনে রেখে একজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতিকেই ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে ক্রিকেট মহলে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ দলের সমর্থকেরা যদি জাতীয় দলের জার্সি পরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করেন, সেটিকেও সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সমর্থকদের স্বাভাবিক সমর্থন প্রকাশকে ঝুঁকি হিসেবে দেখানোয় প্রশ্ন উঠেছে- তাহলে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে সমর্থকদের ভূমিকা ঠিক কোথায় দাঁড়ায়?
তৃতীয়ত, চিঠিতে বলা হয়েছে দেশটিতে নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই নাকি দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে এনে পুরো টুর্নামেন্ট আয়োজনের কাঠামোতেই সংশয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে আইসিসি, যা আগে কখনো এত সরাসরি দেখা যায়নি।
এই তিনটি যুক্তির ভিত্তিতে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজন নিয়ে জটিলতা আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আগেই নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং বিকল্প ভেন্যুর দাবি তুলেছে। সব মিলিয়ে, ক্রিকেটের মাঠের লড়াইয়ের বাইরে গিয়ে এই ইস্যু এখন পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আরেক নাম হিসেবে।
এসব বিষয় গণমাধ্যমের সামনে আনেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কার্যালয়ে গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইসিসির নিরাপত্তা দলের চিঠির প্রসঙ্গ সামনে আনেন আসিফ। কী কী কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে, বলা হয়েছে চিঠিতে। ‘বাংলাদেশ দলে যদি মোস্তাফিজুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশ দলের সমর্থকরা যদি জাতীয় দলের জার্সি পরে ঘোরাফেরা করে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে তত নাকি বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে।’
বিশ্বকাপের দল এরই মধ্যে দিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে আছেন বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজ। বিশ্বকাপের পর আইপিএলে তার খেলার বিরুদ্ধে ছিলেন ভারতের কিছু রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা। এর প্রেক্ষিতে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। পরে তাকে ছেড়ে দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। এর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। ভারত থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
আইসিসিকে দুটি চিঠি দিয়েছে বিসিবি। এর একটির জবাব দিয়েছে আইসিসি। সেই চিঠির সূত্র ধরেই আসিফ বললেন, বাংলাদেশের শঙ্কার জায়গা সঠিক। ‘আইসিসি সিকিউরিটি টিমের এই বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে, ভারতে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার কোনো রকম পরিস্থিতি নাই। আইসিসি যদি আশা করে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ বোলারকে বাদ দিয়ে আমরা ক্রিকেট টিম করব, আমাদের যারা সমর্থক আছে তারা বাংলাদেশের জার্সি পরতে পারবে না, আর আমরা ক্রিকেট খেলার জন্য বাংলাদেশের নির্বাচন পিছিয়ে দেব- তাহলে এর চেয়ে উদ্ভট, অবাস্তব ও অযৌক্তিক কোনো প্রত্যাশা হতে পারে না। আমরা মনে করি, ভারতে যে উগ্র সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং বাংলাদেশ বিদ্বেষী যে পরিবেশ বিরাজ করছে, বিশেষ করে গত ১৬ মাস ধরে বাংলাদেশ বিদ্বেষী যে অব্যাহত প্রচারণা চলেছে এটার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পক্ষে ভারতে ক্রিকেট খেলা অসম্ভব ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মোস্তাফিজের পর্ব এবং এর পরে আপনাদের যে চিঠির কথা বললাম সেটার মাধ্যমে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’
আইসিসির চিঠিতে কী আছে, বিসিবি এখনও প্রকাশ করেনি। এই বিষয়ে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদিনকে ফোন করা হলেও তারা ধরেননি। তবে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ম্যানেজার শাহরিয়ার নাফীস বলেন, চিঠিতে কী লেখা আছে তার জানা নেই। ‘এমনিতে আইসিসির সঙ্গে বিসিবির যোগাযোগ ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের মাধ্যমেই হয়। তবে এই ব্যাপারে যোগাযোগ হচ্ছে সরাসরি বিসিবি সভাপতি ও প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে। এই চিঠি আমার এখতিয়ারের বাইরে।’
কলকাতা ও মুম্বাই থেকে বাংলাদেশের ম্যাচ চেন্নাই ও ত্রিভেন্দ্রামে সরিয়ে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও কথা বলেন আসিফ। আইসিসি অবশ্য এখনও এই ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তারা শ্রীলঙ্কায় দেবে না, দুইটা ভেন্যু পরিবর্তন করে কেরালা এবং ত্রিভান্দ্রামে দেবে। দুইটা ভেন্যুই তো ভারতেই! আর জিজ্ঞেস করছেন কেন? আমিতো বললাম ভারত মানে তো ভারতই। আমরা ভারতের কথা বলছি, আমরা তো কলকাতা বলি নাই। তাই আমাদের বক্তব্য, যদি কলকাতা থেকে পরিবর্তন করে অন্য ভেন্যুতে দেওয়া যায়, শ্রীলঙ্কায় দেওয়া যাক সমস্যা না। পত্রিকায় দেখলাম, আমি জানি না সত্যি নাকি মিথ্যা, পাকিস্তান নাকি আমাদের ম্যাচগুলো আয়োজন করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তানে করেন কোনো সমস্যা না, সংযুক্ত আরব আমিরাতে করেন কোনো সমস্যা না। কিন্তু যেখানে আমাদের দলের একটা খেলোয়াড়ের খেলার পরিবেশ নাই, এই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে মাথা নত করে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)- যখন বলে তাকে এখানে খেলানো না হোক, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে আইসিসির সামনে আমি বুঝলাম না।
তবে আসিফ নজরুলের দেওয়া এসব বক্তব্য আইসিসির আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব নয়, বিশ্বকাপ ইস্যুতে নিরাপত্তা শঙ্কা পর্যালোচনায় আইসিসির আন্তঃবিভাগীয় আলোচনার অংশ এটি বলে জানিয়েছে বিসিবি। আসিফের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমনটা জানিয়েছে ক্রিকেট বোর্ড।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি বলেছে, ‘যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার বক্তব্যে আইসিসি-সংক্রান্ত যে চিঠির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি মূলত বিসিবি ও আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের মধ্যে হওয়া একটি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ। এই যোগাযোগ ছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন সংক্রান্ত। এই চিঠিকে বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিসিবির আনুষ্ঠানিক আবেদনের জবাবে আইসিসির চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরা যাবে না।’
বোর্ড আরও জানায়, দলের নিরাপত্তার স্বার্থে ভেন্যু সংক্রান্ত উদ্বেগ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে আয়োজনের অনুরোধ করেছে। তবে এ বিষয়ে আইসিসির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা লিখিত জবাব পায়নি বিসিবি।
বিসিবি নিশ্চিত করেছে, বিষয়টি নিয়ে তারা আইসিসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
কেকে/ আরআই