আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি পোস্টাল ব্যালটে কিছু রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক প্রথম লাইনে প্রদর্শিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, পোস্টাল ব্যালটে আগে কয়েকটি দলের প্রতীক রাখা ‘উদ্দেশ্যমূলক’। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং দেশের ভেতরে একই কৌশল প্রয়োগ রোধের দাবি করেছেন। এ ছাড়া বিদেশে কিছু বিশেষ গোষ্ঠী ব্যালট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ তুলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না করা গেলে ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ব্যালট সংরক্ষণ ও গণনার প্রতিটি ধাপেই সন্দেহের অবকাশ থেকে যাবে, যা সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে এমনটিই মনে করছে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের প্রশ্ন- ডাকযোগে প্রেরিত ব্যালট কতটা নির্ভুল ও নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা হবে, ভোট গণনার সময় সব কেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে কি না, কিংবা পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা আদৌ থাকবে কি না। এসব বিষয়ে স্বচ্ছ যাচাই ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি থাকলে পোস্টাল ভোটই নির্বাচন কারসাজির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে বৈঠক শেষে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, পোস্টাল ব্যালটে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের অনেক ভাই-বোনেরা তাদের ভোট প্রয়োগ করবেন। তাদের কাছে যে ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে সেই ব্যালট পেপারে কেউ মনে করতে পারেন ঘটনাক্রমে, কিন্তু আমরা বলি যে এটা খুব ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল, তাদের নাম এবং প্রতীকটা প্রথম লাইনে দেওয়া হয়েছে। অথচ বিএনপির নাম এবং প্রতীক ঠিক মাঝখানে দেওয়া হয়েছে যেটা ভাঁজ করলে কাগজটা-এটা ভালো করে ‘নজরেই পড়বে না’।
এ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে কথা বলেছি তাদের সঙ্গে। তাদের কথায় মনে হয়েছে যে তারা বিষয়টি ঠিক ওইভাবে খেয়াল করেন নাই এবং ‘অ্যালফাবেটিক্যালি’ ঠিক আছে কি না, এটাই তাদের কাছে বিবেচনার বিষয় ছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকে বলেছি যে, আপনারা এখানে পাঁচটা কলাম করেছেন এবং ১৪টা লাইন করেছেন যার ফলে তিনটি রাজনৈতিক দল বিশেষ রাজনৈতিক দল তাদের নাম ও প্রতীকটা প্রথম লাইনে এসে গেছে। এটা যদি ৫টা না হয়ে ৬টা কলাম হতো বা ৪টা কলাম হতো, ১৪টার জায়গায় যদি ১২টা বা ১৬টা লাইন হতো তাহলে কিন্তু এই ব্যাপারটা এভাবে সাজানোর সুযোগ ছিল না। কাজেই ব্যাপারটা ‘ইচ্ছাকৃতভাবেই’ করা হয়েছে এবং আপনার হয়তো নজরে পড়ে নাই, কিন্তু যারা আসলে ভেতরে কাজটা করেছে সম্ভবত তারা এটা কোনো ‘উদ্দেশ্য’ নিয়ে করেছে।’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা তাদেরকে (নির্বাচন কমিশন) পরিষ্কার বলেছি যে এই কৌশল যেন দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে কার্যকর করা না হয়। এটা যেন সংশোধন করা হয়। এ ছাড়াও বিদেশে একটি ‘বিশেষ’ গোষ্ঠী ব্যালট পেপার নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও বিএনপি বৈঠকে অভিযোগ তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, এই পোস্টাল ব্যালট পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যে পদ্ধতিতে বিতরণ করা হচ্ছে এবং এটা সঠিক হচ্ছে না, এতে কিছু ত্রুটি হচ্ছে। যার নমুনা আমরা দেখেছি যে বাহরাইনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ তারা এই অনেকগুলো ব্যালট পেপার, তারা সেটা হ্যান্ডেল করছে। এটার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, ভাইরাল হয়ে গেছে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান, আমরা মনে করি যে যারাই এই নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার জন্য এটাকে কারচুপি করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে যেন আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গত বছর নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও পোস্টাল ব্যালট কার্যকর করার সুপারিশ করেছিল। তবে তারা যে সুপারিশ করেছিল, ইসি সেটি গ্রহণ করেনি। ইসি এরই মধ্যে নিবন্ধিত প্রবাসীদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা ভোট দিয়ে তা ফেরত পাঠাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ভেতরে ভোটার তালিকা ও এনআইডি যাচাই যেখানে এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়, সেখানে বিদেশে বসবাসরত লাখো ভোটারের পরিচয়, উপস্থিতি ও সম্মতির সত্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। পোস্টাল ব্যালট বা অনলাইন ভোটিংয়ের ক্ষেত্রে ভোটার নিজে ভোট দিচ্ছেন নাকি অন্য কেউ তার পক্ষে ভোট দিচ্ছেনÑ তা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যালট কখন পাঠানো হলো, কে গ্রহণ করল, কখন পূরণ হলো এবং কীভাবে তা ফেরত এলো- এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ নজরদারির অভাব থাকলে ফলাফল সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, কোনো কোনো আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা বেশি হলে তা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, বর্তমানে যেভাবে পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানে একাধিক ধাপ রয়েছে, যা অনেকটাই একটি ‘ব্ল্যাক বক্স’-এর মতো। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে এবং কারসাজির অভিযোগ ওঠার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এমনকি প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কেউ কেউ ভোট দিয়ে ফেলছেন- এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।
বদিউল আলম মজুমদারের আশঙ্কা, যদি কোনো আসনে পোস্টাল ভোটের কারণে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়, তাহলে তা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও অভিযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও ব্যবস্থার মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে পদক্ষেপগুলো এর মধ্যে প্রবাসী নাগরিকদের জন্য ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করে দিয়ে সরকার ভালো করেছে। প্রথম প্রথম কিছু সমস্যা হবে, আস্তে আস্তে সমস্যা কেটে যাবে এবং প্রবাসী নাগরিকরা ভোট প্রদানের জন্য উৎসাহিত হবে।
পোস্টাল ভোট নিবন্ধন :
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে দেশ ও দেশের বাইরে নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে দেশের ভেতরে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন। আর বাকি ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী বাংলাদেশি। প্রবাসীরা নিবন্ধন করেছেন ১২৩টি দেশ থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন নিবন্ধন করেছেন। ৩০০ আসনের মধ্যে ফেনী-৩ আসনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৯০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। আর ৬৪ জেলার মধ্যে কুমিল্লা জেলার সর্বোচ্চ ১ লাখ ১২ হাজার ৯০ জন প্রবাসে থেকে নিবন্ধিত হয়েছেন। দেশের ভেতরে যারা ডাকযোগে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন, তাদের মধ্যে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ জন সরকারি চাকরিজীবী, ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ জন নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত, ১০ হাজার ১০ জন আনসার-ভিডিপি। আর কারাগার থেকে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ৬ হাজার ২৮৩ জন।
আসনভিত্তিক পোস্টাল ভোটার :
জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসনভিত্তিক হওয়ায় প্রতিটি আসনে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্ব পাচ্ছে। সাধারণভাবে অধিকাংশ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে বড় হলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে বিজয় ও পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল ১০ হাজার ভোটেরও কম ব্যবধানে। সে কারণে আসন্ন নির্বাচনে পোস্টাল ভোটারদের সংখ্যা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
ইসির হিসাব অনুযায়ী, চলতি নির্বাচনে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য ১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেনÑএমন আসন রয়েছে ১৮টি। এর মধ্যে একটি আসন ছাড়া বাকি সবগুলোই চট্টগ্রাম বিভাগভুক্ত। পোস্টাল ভোটার নিবন্ধনে শীর্ষে রয়েছে ফেনী-৩ আসন, যেখানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৮ জন।
এ ছাড়া সাড়ে ১২ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোটার নিবন্ধিত রয়েছে-এমন আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজার ২৭২ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ১৩ হাজার ৯৩৮ জন, নোয়াখালী-১ আসনে ১৩ হাজার ৫৯২ জন, নোয়াখালী-৩ আসনে ১২ হাজার ৭৪৫ জন এবং ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৫৪১ জন ভোটার।
অন্যদিকে, ১০ হাজারের বেশি কিন্তু সাড়ে ১২ হাজারের কম পোস্টাল ভোটার নিবন্ধন হয়েছে- এমন আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা-৪, ৫, ৬, ৯ ও ১১, সিলেট-১, চাঁদপুর-৫, নোয়াখালী-৪ ও ৫, ফেনী-১, কক্সবাজার-৩ এবং লক্ষ্মীপুর-২ আসন।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারের কম পোস্টাল ভোটার নিবন্ধন হয়েছে-এমন আসন রয়েছে ৯৭টি। বাকি আসনগুলোতে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৫ হাজারেরও কম। এর মধ্যে সর্বনিম্ন নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে, যেখানে মাত্র ১ হাজার ৫৪৪ জন ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নাম নিবন্ধন করেছেন।
ডাক বিভাগ ছাড়া অন্য চ্যানেলে পাঠালে বাতিল হবে ভোট :
পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে যারা ভোট দেবেন, তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের ডাক বিভাগের মাধ্যমেই তা ফেরত পাঠাতে হবে। অন্যথায় ভোট বাতিল হবে। এক বিজ্ঞপ্তিতে এমন তথ্য জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশের ডাক বিভাগের মাধ্যমে আপনার পোস্টাল ব্যালট প্রেরণ করুন। সকল পোস্টাল ব্যালটে ইউনিক কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা সংযুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের চ্যানেল ব্যতীত অন্য কোনো মাধ্যমের মাধ্যমে প্রেরিত পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং অফিসারগণ কর্তৃক গৃহীত হবে না।
কেকে/এমএ