ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। চলছে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। প্রতীক বরাদ্দের পর বুধবার (২২ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচারে নামবে দলগুলো। এ সময়ই অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্যে সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। সেদিন এক অনুষ্ঠানে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি নিশ্চিত—এই তরুণদের অনেকেই এবারের নির্বাচনে জয় লাভ করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার এমন বক্তব্য দেওয়া সমীচীন নয়, যাতে বিশেষ কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রতীয়মান হয়। কিন্তু তিনি তা করেছেন। এতে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টা শুরু থেকেই বলে আসছেন—শিক্ষার্থীরাই তার নিয়োগকর্তা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই শিক্ষার্থীরাই এখন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। ফলে নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে তাদের প্রতি কোনো পক্ষপাত রাখা যাবে না। শুধু এনসিপি নয়, কোনো দলের প্রতিই সরকারপ্রধান বা সরকারের কোনো অনুকম্পা কিংবা বিরাগ থাকা চলবে না। সরকারকে থাকতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। এই নির্বাচন বাংলাদেশের আগামীর ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে সরকারকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘এই সরকার কিছুটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতোই কাজ করছে। ফলে কোনো তরুণ, যুবক বা পৌঢ়—কারও পক্ষেই প্রধান উপদেষ্টার এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া শোভন নয়। এটি তার মর্যাদার সঙ্গে যায় না।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এর মাধ্যমে সরকার কি এমন কোনো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা (এনসিপি) যাতে নির্বাচনে জিততে পারে, সে ব্যাপারে সরকার ভূমিকা রাখতে পারে?’
সাইফুল হক আরও বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার এ ধরনের বক্তব্যে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, যা কাম্য নয়। সরকারপ্রধান হিসেবে তার নিরপেক্ষতা ধরে রাখা জরুরি। না হলে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হবে।’
কী বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা?
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এ দেশের তরুণরা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেছে এবং খুব শিগগিরই ১২ ফেব্রুয়ারি তারা ব্যালটে থাকবে। আমি নিশ্চিত, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন।”
তিনি মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল লা মেরিডিয়ানে ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা–২০২৬’ শীর্ষক দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “সেদিন তারা আমাদের ক্লাসরুমে ছিল। এখন তারা রাস্তায় নেমেছে এবং নিজেদের একটি রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়েছে। তারা নির্বাচিত হলে কেউ না কেউ শিক্ষামন্ত্রী হবেন। শিক্ষা নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদ সম্প্রদায়কে ভাবতে হবে—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কেমন হবে, কেমন হওয়া উচিত। এটি এক ভিন্ন ধরনের পৃথিবী। তাই পৃথিবীতে কী ঘটছে, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।”
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান হয়েছিল ২০২৪ সালে, এখন জানুয়ারি ২০২৬। এই কারণেই আমি আশা করি, এই সমাবেশে এবং আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেওয়া হবে। আমরা কোথায় আছি, কী মিস করেছি, কীভাবে পিছিয়ে পড়ার পরিবর্তে সামনে এগোতে পারি—এটাই আজকের চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার নামে আমরা যেসব বিষয় পাশ কাটাই, সেগুলো ঠিক না করলে বারবার সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে। আমি আশা করি, আপনারা সেই নেতাদের কয়েকজনকে আমন্ত্রণ জানাতে পারবেন এবং জানতে পারবেন—তারা কেন শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে এবং তাদের প্রত্যাশা কী, শ্রেণিকক্ষে কী অনুপস্থিত ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “এখন নির্বাচনের সময়। নির্বাচন আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি। অভ্যুত্থান সবকিছু ভেঙে দিয়েছিল। যেগুলো আমরা আটকে রেখেছিলাম, সেগুলো পূর্বাবস্থায় ফেরাতে তারা তাদের নিজস্ব সনদ—জুলাই সনদ—তৈরি করেছে। ভবিষ্যৎ কী হবে, তা গ্রহণ করার জন্য গণভোট হবে। বাংলাদেশে এমন হওয়া উচিত। সংবিধান নিয়ে ভুল করা যায় না।”
পোস্টাল ব্যালট নিয়েও প্রশ্ন
একটি বাসায় কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বহু পোস্টাল ব্যালট গণনা করছেন—এমন একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টাল ব্যালটের খামে বাহরাইনের ঠিকানা লেখা রয়েছে। এতে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে। কারও অভিযোগ, পোস্টাল ব্যালট কারসাজির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির দাবি, একটি ‘বিশেষ রাজনৈতিক দলের’ নেতারা এ কাজে জড়িত ছিলেন।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি পোস্টাল ব্যালটে কিছু রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক প্রথম লাইনে প্রদর্শিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, পোস্টাল ব্যালটে আগে কয়েকটি দলের প্রতীক রাখা উদ্দেশ্যমূলক। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দেশের ভেতরে একই কৌশল প্রয়োগ রোধের দাবি জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি বিদেশে কিছু বিশেষ গোষ্ঠী ব্যালট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ তুলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
কেকে/এলএ