মাস পেরোলেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন। গতকাল রোববার মনোনয়পত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে।
আগামী ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামবেন প্রার্থীরা। এর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু তুলে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের প্রার্থীকে নিয়ে বিষোদগার, আগ্রাসী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি পরিবেশ অস্থিতিশীল করছেন এনসিপির নেতারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটে গিয়ে নিজেদের মধ্যপন্থি ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এনসিপি। অনেক নেতাকর্মী এরই মধ্যে দল ছেড়েছেন। অনেকে দল না ছাড়লেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এদিকে জামায়াতের জোটে গিয়েও নির্বচানে প্রত্যাশী ফল এনসিপির পাওয়ার সম্ভাবনা। এতে দলটির অনেক নেতা ভড়কে গিয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছেন। কেউ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে সংঘাত সৃষ্টি করতে চাইছেন। কেউ নানা অজুহাতে নির্বাচন কমিশনকে হুমকি দিচ্ছেন।
সর্বশেষ গত শনিবার দ্বৈতনাগরিকত্বের ইস্যুটিকে সামনে এনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এর আগে ইসি পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তুলে, নির্বাচন রুখে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, গতকাল রোববার তিনি ইসির আপিল শুনানিতেও গিয়েছেন। আসিফ মাহমুদ নিজে প্রার্থী নন। কোনো প্রার্থীর এজেন্ট বা প্রতিনিধিও নন।
সূত্র জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদ আপিল শুনানিতে গিয়েছেন কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের মনোনয়নপত্র বাতিলে ইসির ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য।
আসিফ মাহমুদের এ তৎপরতাকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইসির আপিল শুনানি চলাকালীন এ ধরনের বক্তব্য অনুচিৎ। ঋণখেলাপি ও দ্বৈতনাগরিকত্ব ইস্যুতে এবার কোনো ছাড় দিচ্ছে না ইসি। এরই মধ্যে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে এ কারণে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আসিফ মাহমুদের এমন বক্তব্য ষড়ন্ত্রেরই নামান্তর।
ইসিকে আসিফ মাহমুদের ‘রেডলাইন’: প্রার্থিতা-সংক্রান্ত আপিল শুনানির শেষ দিনটিকে ইসির জন্য ‘রেডলাইন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। গত শনিবার তিনি বলেন, ‘ইসি পক্ষপাত করে বা কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের পার করে দেওয়ার চেষ্টা করলে, আমরা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাব।’
তিনি আরও বলেন, তারা (ইসি) কোনোভাবেই একটা যাচ্ছেতাই নির্বাচন করার সুযোগ দেবেন না। যেনতেন নির্বাচন করার চেয়ে প্রয়োজনে এই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে কিছুদিন দেরি করে হলেও একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করাটাই থাকবে তাদের মূল অগ্রাধিকার। এনসিপির মুখপাত্র বলেন, ‘কোনো দ্বৈত নাগরিক, কোনো ঋণখেলাপিকে আমরা নির্বাচনে অংশ নিতে দেব না।
এর জন্য সব উপায়ে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। সেটা আইনি লড়াই হোক, রাজপথের লড়াই হোক কিংবা সর্বশেষ প্রয়োজন হলে আমরা সেই আসনে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’
ইসিতে আগ্রাসী হাসনাত আব্দুল্লাহ : গতকাল নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল শুনানির একপর্যায়ে ফেনী-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টু এবং আব্দুল্লাহর মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়েছে। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় হট্টগোল।
গত শনিবার দুপুরে নির্বাচন ভবনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আফরোজা খানমের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি চলাকালে এই ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, আইনজীবীদের ব্যাখ্যা শেষে কমিশন দুপুরে আধাঘণ্টার জন্য শুনানি মুলতবি করলে কমিশন কক্ষ ত্যাগের পর আইনজীবীদের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বিরোধী পক্ষের উদ্দেশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এতে অডিটোরিয়ামে অন্য শুনানির জন্য উপস্থিত এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ আপত্তি জানালে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়।
একপর্যায় তাবিথ আউয়াল তার বাবা আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে কমিশন থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আবদুল আউয়াল মিন্টুকে উদ্দেশ্য করে হাসনাত বলেন, তার মতো বিদেশে টাকা পাচারকারী এলিটব্রিড আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের ব্যবসা ঠিক রাখে। রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যারা ব্যবসা করেন, সেফ এক্সিট নেন, তাদের চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশে দেখতে চাই না।
পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা চলছে, রুখে দেওয়া হবে : এর আগে গত ৬ জানুয়ারি আসিফ মাহমুদ বলেছিলেন, আপাতদৃষ্টিতে আরও একটি পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা চলছে। ওই চেষ্টা রুখে দিতে ভোটের আগেই মাঠে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
আসিফ বলেন, আবারও পুরোনো সেটেলমেন্টের পথে গেলে তা রুখে দেওয়া হবে। ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে না।
কেকে/এমএফ