ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তৃণমূলে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলটির নেতাকর্মীদের লাগামহীন আচরণ, স্থানীয় রাজনীতিতে দলের অভ্যন্তরে পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা।
বিশেষ করে নির্বাচনে দলের মনোনীত ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি। এতে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
অতিসম্প্রতি ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ছুরিকাঘাতে নজরুল ইসলাম নামে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক কর্মী নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের রামসিংহপুর গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক ছিলেন।
এ ঘটনায় ৬৩ জনের নামে মামলা হয়েছে। মামলায় বিএনপির ৩৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় ২৫ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
গত শনিবার দুপুরে নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে সোলায়মান বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় মামলা করেন বলে জানান ধোবাউড়া থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম।
দলীয় সূত্র বলছে, বহিষ্কারসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দলটির নেতাকর্মীদের থামানো সম্ভব হচ্ছে না।
এরমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নিজেদের কোন্দলে খুন-জখম যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সূত্র মতে, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানে এক মাসও বাকি নেই। দলীয় প্রধানের দেশে আসার পরও বিএনপি নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে জনমনে এখনো কিছু অনিশ্চয়তাসহ নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দলের অনেক নেতাকর্মী।
কয়েকজন খুনের পর প্রতিক্রিয়া দেখালেও সবশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির হত্যার পর দলটির গা ছাড়া মনোভাবের কারণে অনেকেই আশাহত।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ২০২৫ সালে ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন।
বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুধু ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩ জন। তালিকায় রয়েছে ঢাকা, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলা।
সূত্র মতে, গত ৩ জানুয়ারি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
৯ জানুয়ারি জয়পুরহাটে যুবদল নেতা ইয়ানুল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৭ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীতে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক বিরু মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সবশেষ ঢাকায় কাওরান বাজারে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা।
দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীরা এমন হামলা-হত্যার শিকার হলেও আগের মতো দৃঢ় বা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না দলটির হাইকমান্ড। শোক জানিয়ে অনেকটা দায় সারা হচ্ছে।
হত্যার বিচার দাবিতে জোরালো কোনো আন্দোলন, সভা-সমাবেশ কিংবা মানববন্ধনও দেখা যায়নি। মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে কিছু প্রতিক্রিয়া, দলীয় কার্যালয়ের সামনে জানাজা হলেও সেখানে দলের শীর্ষ নেতাদের কাউকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা হামলা ও খুনের শিকার হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই হচ্ছে। তাই এসব বিষয় নিয়ে তেমন কিছু করতে পারছে না বিএনপি। এছাড়া আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরব হচ্ছে না, যাতে নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি নেতিবাচক না হয়।
এ নীরবতা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ডের পর। বিএনপি এসব হত্যাকাণ্ড বা হামলার ঘটনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঠেকাতে কিছু অপশক্তি বাধা সৃষ্টি করতে চায়। অনেকেই নানাভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।
তবে এ দেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে পরিশুদ্ধ। এভাবে হামলা বা খুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা থামানো যাবে না। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
এটি সরকারের দায়িত্ব। আমরা সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, মূলত চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে কেন্দ্র করেই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়াচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। যেহেতু আগামীতে এমপিদের আস্থাভাজনরাই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তাই মনোনয়নকে কেন্দ্র করে কোন্দল আরও বাড়ছে।
এ অবস্থায় জনগণকে ক্রমশ বিতশ্রদ্ধ করে আস্থার পরিস্থিতিকে ক্রমশ তলানিতে পৌঁছে দিচ্ছে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।
কেকে/এমএফ