আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। যার ফলে জনসাধারণের কাছে এই নির্বাচন অন্যতম গুরুত্ব বহন করছে। যদিও শেখ হাসিনার দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তবু দলটির সমর্থকরাই শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনে বিজয়ী নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ আওয়ামী লীগের রয়েছে বিশাল ভোটব্যাংক। দলটি যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, সেহেতু প্রশ্ন উঠছে তাদের ভোটগুলো কোন দলে যাবে? এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অনেকে মনে করছেন, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে আওয়ামী লীগের ভোট পড়বে। তার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ছিলো আওয়ামী লীগের সহযোগী দল। আর ইসলামী আন্দেলন বাংলাদেশ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন করছে। এ জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ছিল। এনসিপি-জামায়াতের জোটকে তো স্বাভাবিকভাবে ভোট দেবে না আওয়ামী লীগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ কখনো স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি জামায়াতকে ভোট দবে না। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি এনসিপিকে তো ভোট দেওয়ার প্রশ্নই নেই। তা ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর মামালা-হামলার শিকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। যার বেশিরভাগই করেছে বিএনপি। সুতরাং ধরে নেওয়া য়ায়, আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটের বেশিরভাগই যাবে লাঙ্গল ও হাতপাখা প্রতীকে।
ভোটের আর এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে জনমত জরিপগুলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। আসন্ন নির্বাচন মূলত দুই শক্তির লড়াই। তারা হলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বনাম জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচন করতে না পারলেও তাদের কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দশকের পর দশক ধরে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও ৩০-৪০ শতাংশের মধ্যে ছিল; পতনের পর তা কমলেও এখনো উল্লেখযোগ্য। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এনসিপির ধর্মনিরপেক্ষ অংশ ভেঙে যাওয়ায় তরুণ প্রগতিশীল ভোটার টানার আশা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য জাতীয় পার্টির (জাপা) ১৯৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে বলে জানিয়েছে দলটি। গতকাল জাপা এই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে। এর আগে এদিন দলের চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলনে ১৯৬ জন বৈধ প্রার্থীর কথা জানান। জিএম কাদের বলেন, “১৯৬ জন বৈধ প্রার্থী পেয়েছে জাপা। এদের মধ্যে ৬ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন। পরবর্তীতে আরও ২-৩ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।” জাপার এই প্রার্থী তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলো।
তথ্যসূত্র বলছে, ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য রয়েছে বর্তমান জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ ঠিকই অংশগ্রহণ করে। ১৯৭৫ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। যদিও ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একাট্টা সমর্থন ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পার্টি ৮৬ সালের ঋণ ঠিক ১০ বছর পর পরিশোধ করার সুযোগ পায় ৯৬ সালে গিয়ে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একাট্টা সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি কিছু দিনের জন্য সঙ্গী হলেও ২০০৬ সালে পল্টি মেরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সাথে যোগ দেয়। পরে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হয়ে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তারা সরকার গঠন করে। তা ছাড়া ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে যখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বৈধতার মহাসঙ্কটে ভুগছিল ঠিক তখনই আওয়ামী লীগকে উদ্ধারে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় ওই জাতীয় পার্টি। সেই সহানুভূতির জায়গা থেকে এবার আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে ভোট আদান-প্রদানে বড় ধরনের সমঝোতায় যাওয়ার হিসাব-নিকাশ চলছে।
জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের) প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ বলেন, আমরা নির্বাচনি মাঠে থাকলে বিএনপির সুবিধা হবে। আমাদের ভোট বিএনপি পেতে পারে, কিন্তু কখনোই জামায়াত পাবে না। জাপার এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা নির্বাচনে অংশ নেব এটা ভাবতে পারিনি। নির্বাচনের জন্য আমরা আসলে প্রস্তুত ছিলাম না।
এ বিষয়ে দেশে এবং বিদেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির এবং সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোকজন মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছেন আবার কেউ কেউ জমাও দিয়েছেন। তাদের যদি প্রার্থিতা টিকে যায় তাহলে শেষমেশ দীর্ঘদিনের সহযোগী জাতীয় পার্টির সঙ্গে কৌশলগত ভোটের আদান-প্রদান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সেটা রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, আওয়ামী লীগ যখন রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে পড়েছে ঠিক তখনই বৈধতা দিয়েছে জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের সহযোগী জাতীয় পার্টি- এটা ঐতিহাসিক সত্যও বটে। গত ১৫ বছর জাতীয় পার্টি যদি আওয়ামী লীগকে একাট্টা সমর্থন না দিত তাহলে দেশের রাজনীতিতে এই সঙ্কট তৈরি হতো না।
তিনি বলেন, আগে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে বসে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টিসহ অন্যরা।
কেকে/এমএ