মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আলুর বাম্পার ফলনেও লোকসানে কৃষক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৪৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশের প্রধান আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে মাঠপর্যায়ে আলুর দাম নেমে আসায় কৃষক, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদার- সব পক্ষই চাপে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট এবং গভর্নর অফিসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপ দলটি ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলা পরিদর্শন করে পাঁচটি কৃষি পণ্য, যেমন ধান-চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি এবং ডিম জরিপ করে। জরিপটি ১৫ জুন ২০২৫ থেকে ৭ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালিত হয়।

গবেষণায় ধান-চাল থেকে শুরু করে আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম- দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা ও সম্ভাবনার চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ কৃষক গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে বেশি জমিতে আলু চাষ করেছেন, যার ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা না থাকায় কৃষকরা আলু দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই লোকসান গুনছেন।

মাঠ থেকে সরাসরি আলু বিক্রি করে কৃষকরা কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১৩ টাকা এবং বাড়ি থেকে বিক্রি করে মাত্র ১২ টাকা পাচ্ছেন। অথচ গত মৌসুমে আলুর দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৪৫ টাকা।

চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকা, যা আগের মৌসুমে ছিল ১৪ টাকা। লিজ ভাড়া বৃদ্ধি, বীজের উচ্চমূল্য এবং বিশেষ করে সারের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, মোট উৎপাদন ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ খরচ হয় বীজে এবং ২১ শতাংশ ব্যয় হয় সার ও কীটনাশকে।

ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা মাঠ থেকে কেজিপ্রতি ১৩ টাকা এবং কৃষকের বাড়ি থেকে ১১ টাকায় আলু কিনছেন। প্রতি কেজিতে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাবদ ১ দশমিক ৫ থেকে ২ টাকা ব্যয় হওয়ার পর তাদের লাভ থাকছে মাত্র ২৫ পয়সা থেকে ১ টাকা।

তারা মূলত নিজস্ব পুঁজিতে আলু কিনে শহরের আড়তে পাঠানো, ট্রাক লোড সিস্টেমে অগ্রিম অর্থ নিয়ে আলু কেনা এবং কমিশনভিত্তিকভাবে আড়তদারের হয়ে আলু সংগ্রহ- এ তিন পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

আড়তদাররা মৌসুমের শুরুতে কেজিপ্রতি ১৫ টাকায় আলু কিনলেও পরে তা কমে ১৩ টাকায় নেমে আসে। খরচ বাদে আড়তদারদের লাভ কেজিপ্রতি ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। কম দামের কারণে তারাও লাভের আশায় হিমাগারে আলু মজুত করছেন।

জরিপে হিমাগারের ধারণক্ষমতা ব্যবহারের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কৃষকরা মোট ধারণক্ষমতার ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছেন। ফড়িয়ারা ব্যবহার করছেন ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ, আড়তদাররা ১০ থেকে ৬০ শতাংশ, করপোরেট ব্যবহারকারীরা (মূলত বীজ আলু) ২০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং মৌসুমি মজুতদাররা ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ৬ দশমিক ৭৫ টাকা হিমাগার ভাড়া প্রকৃত পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় বেশি এবং তা কমানোর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমানে হিমাগারের গেট মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়েও কম। সরকার যদি দ্রুত আলু রপ্তানি বা ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে আলু কেনা শুরু না করে, তবে বাজারে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুপারিশ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় আলু চাষিদের জন্য স্বল্প ব্যয়ে আলু সংরক্ষণের মডেল ঘর নির্মাণে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালু করতে পারে। একইসঙ্গে সার ডিলারদের দ্বারা মূল্য কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আলু সংগ্রহে সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চালের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় দাম ঊর্ধ্বমুখী

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় মোটা চালের খুচরা মূল্য ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৬১ টাকায় এবং চিকন চালের মূল্য ১১ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৭৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে উৎপাদন ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

মজুরি বৃদ্ধি এবং সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় মোটা চালের উৎপাদন খরচ ৩৫ শতাংশ এবং চিকন চালের উৎপাদন খরচ ১৮ শতাংশ বেড়েছে। একইসঙ্গে আলু ও পেঁয়াজের মতো লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়ায় ধানের আবাদি জমি ও ফলন উভয়ই কমেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ঈদের টানা ১০ দিনের ব্যাংক ছুটির কারণে ধান কেনাবেচা ও চালকলের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে।

চাল খাতে সুপারিশ হিসেবে গবেষণায় চিকন চালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ধানের গুণগত মান রক্ষায় প্রতিটি অঞ্চলে অটোমেটেড ধান ড্রায়ার স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়লেও বীজ ও সার সংকট

গবেষণায় বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে কৃষকরা কেজিপ্রতি গড়ে ৪৩ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, যেখানে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৩ টাকা।

তবে উচ্চ ফলনশীল বীজের অভাব এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হওয়ায় কৃষকরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক বায়ু প্রবাহযুক্ত প্ল্যাটফর্মে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলে পচন ও ওজন হ্রাস কমে যায় এবং কার্যকর ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ জন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে ৪ শতাংশ সুদে রিফিন্যান্স উইন্ডো চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্রয়লার মুরগি ও ডিম মৌসুমি চাপে ক্ষতি

ব্রয়লার মুরগি ও ডিম খাতে জরিপ চলাকালে খামারিরা ব্রয়লার মুরগিতে কেজিপ্রতি গড়ে ১২ টাকা এবং ডিমে প্রতিটি ৮১ পয়সা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন।

খরচের কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং ডিম উৎপাদনে প্রায় ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয় খাবারের পেছনে।

ডিম ও মুরগির বাজারে অস্থিরতা কমাতে এবং ক্ষুদ্র ও মধ্যম খামারিদের টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠেছে। ডিম উৎপাদনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ২০ থেকে ৫০ হাজার মুরগির খামার পরিচালনাকারী খামারি ও ফিড মিলগুলোর জন্য স্বল্পসুদে ভর্তুকিযুক্ত ঋণ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ থেকে ৩ হাজার মুরগির ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য বিশেষ ভর্তুকিযুক্ত ঋণ সুবিধা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে পোল্ট্রি খাতে ব্যবহৃত ফিড ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

সরকারের প্রতি সুপারিশে বলা হয়েছে, ফিডের দাম অস্বাভাবিক ওঠানামা রোধে ফিডের মূল্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।

সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে পোল্ট্রি খাতের কাঁচামাল আমদানিতে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে অগ্রাধিকার সুবিধা দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া করপোরেট খাত বাদ দিয়ে পোল্ট্রি শিল্পকে কৃষি খাত হিসেবে ঘোষণা করে বিদ্যুৎ বিল, কর ও ঋণ সুবিধায় বিশেষ ছাড় দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  আলু   কৃষক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close