বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা সেন্টমার্টিন। কথা উঠেছিল সেন্টমার্টিন বিদেশিদের দখলে চলে যাচ্ছে। সেন্টমার্টিনে আর পর্যটক যেতে পারবে না। এমন অনেক গুজব উঠেছিল একসময়। সব কিছু মিথ্যা প্রমাণ করেছে কোস্টগার্ড। সাগরের সার্বিক নিরাপত্তায় সবসময় কাজ করে যাচ্ছে বাহিনীটি।
সম্প্রতি সেন্টমার্টিন গেলে বিভিন্ন পয়েন্টে কোস্টগার্ডের জাহাজ নজরে আসে। যার কারণে সেন্টমার্টিনে যাতায়াতরত পর্যটকরা যেমন নিরাপদ তেমনি মিয়ানমারে বিভিন্ন পণ্য পাচারকারীরাও আতঙ্কে থাকে। সর্বশেষ গত বুধবার ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে কোস্টগার্ড।
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের উপকূল, নদী তীরবর্তী এলাকা ও সেন্টমার্টিনকে ঘিরে সাগরে অপরাধমূলক তৎপরতা বাড়ছে। বিশেষ করে ডাকাতি, মাদকপাচার, অবৈধ অস্ত্রের চলাচল ও চোরাচালান উপকূলীয় নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে গত এক বছরে ব্যাপক অভিযান চালিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র, মাদক ও পাচারপণ্য উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোন। পাশাপাশি জেলে উদ্ধার, মানবিক সহায়তা ও নির্বাচনি নিরাপত্তায়ও সক্রিয় বাহিনীটি।
কোস্টগার্ডের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডাকাত ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে পূর্ব জোন ৯৯টি দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৩৯টি দেশীয় অস্ত্র এবং ৪ হাজার ৩১০ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করেছে। এসব অভিযানে আটক করা হয়েছে ১১০ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও ডাকাত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে এত বিপুল অস্ত্রের উপস্থিতি সাগরকেন্দ্রিক অপরাধ বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সঙ্গে এই পরিসংখ্যান কোস্টগার্ডের সক্রিয়তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
মাদক পাচারের বড় রুট উপকূল
কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল ও সাগরপথ দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। কোস্টগার্ড পূর্ব জোন জানায়, এক বছরে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় দুইশ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।
জব্দকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে- ৩৫ লাখ ৯২৪টি ইয়াবা, ৯৯০ গ্রাম ইয়াবা তৈরির কাঁচা পাউডার, ৪ কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস), বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ফেনসিডিল, বাংলা মদ ও গাঁজা। এসব অভিযানে আটক করা হয়েছে অন্তত ১৪০ জন মাদক ব্যবসায়ী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, স্থলপথে নজরদারি বাড়ায় মাদকচক্রগুলো সাগর ও নদীপথকে বেশি ব্যবহার করছে। ফলে কোস্টগার্ডের ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পাচার ও চোরাচালান ও অর্থনীতির ওপর চাপ
সাগর ও বহিঃনোঙ্গরকে ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল ও নিত্যপণ্য পাচারের প্রবণতাও বাড়ছে। কোস্টগার্ড পূর্ব জোন জানায়, এক বছরে বহিঃনোঙ্গর থেকে অবৈধভাবে দেশে পাচারের সময় জব্দ করা হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ১৩ টন জ্বালানি তেল, প্রায় ১৩ টন ভোজ্যতেল, অকটেন, পেইন্ট ও থাইল্যান্ডে প্রস্তুত বিক্রয় নিষিদ্ধ চাল। এ ছাড়া মিয়ানমারে পাচারের সময় উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ, সিমেন্ট, ইউরিয়া সার, সিগারেট ও বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক পণ্য।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের পাচার সরাসরি রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি করে এবং বৈধ ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উপকূলে পাচার ঠেকাতে কোস্টগার্ডের নজরদারি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মৎস্য ও পরিবেশ রক্ষায় অভিযান
সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায়ও অভিযান চালিয়েছে কোস্টগার্ড পূর্ব জোন। এক বছরে বিশেষ অভিযানে জব্দ করা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কেজি জাটকা ও ২২ হাজার কেজি সামুদ্রিক মাছ। মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিয়মিত টহলের মাধ্যমে অবৈধ শিকার ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ‘রৌপ্য পদক ২০২৫’ অর্জন করেছে।
উত্তাল সাগরে মানবিক উদ্ধার
নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক কার্যক্রমেও সক্রিয় কোস্টগার্ড। গত এক বছরে উত্তাল গভীর সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল বা ডাকাতের কবলে পড়ে ভাসমান অবস্থায় থাকা নৌযান থেকে ১৫৯ জন জেলেকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ, বৃক্ষরোপণ ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিও চালানো হচ্ছে।
নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় ইতোমধ্যে সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিনে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ ও বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় ভোটবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে।
অপরাধ বাড়ছে, বাড়ছে তৎপরতাও
উদ্ধার হওয়া অস্ত্র, মাদক ও পাচারপণ্যের পরিমাণ ইঙ্গিত দেয় সাগরকেন্দ্রিক অপরাধ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একই সঙ্গে কোস্টগার্ডের অভিযান ও সাফল্য দেখাচ্ছে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও বাড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলীয় নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের তৎপরতা উপকূলবাসীর কাছে ক্রমেই আস্থার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, সাগরে অপরাধ যত জটিল হচ্ছে, কোস্টগার্ডের দায়িত্বও তত বাড়ছে। অস্ত্র, মাদক ও পাচার রোধের পাশাপাশি জেলে উদ্ধার, মানবিক সহায়তা ও নির্বাচনি নিরাপত্তা সব মিলিয়ে পূর্ব জোনের তৎপরতা উপকূলীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে সমন্বিত নজরদারি ও নীতিগত শক্ত অবস্থান অপরিহার্য।
কেকে/এজে