মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ডিপফেক ও ফেক কন্টেন্টের ভিড়ে সত্যের সন্ধান
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:১১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কন্টেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কোনটি মানুষের লেখা আর কোনটি এআই দ্বারা তৈরি, তা শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। 

সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের বিশাল জগতে তথ্যের অবাধ প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া খবর বা ফেক কন্টেন্টের বিস্তারও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জাল কন্টেন্ট তৈরি করছে এবং একইসঙ্গে কীভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সেই জাল কন্টেন্ট শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা প্রয়োজন। বর্তমান যুগে কন্টেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনটি মানুষের লেখা আর কোনটি এআই দ্বারা তৈরি, তা শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তির হাত ধরেই আসছে সমাধান। কন্টেন্ট শনাক্তকরণের এই সমস্যার সমাধানে অনেক এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী টুলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সরঞ্জামগুলো কিছু দিক থেকে ৯৯ শতাংশেরও বেশি নির্ভুলতার সঙ্গে এআই দ্বারা তৈরি কন্টেন্ট খুঁজে বের করতে সক্ষম, এমনকি যখন সেটি মানুষের লেখার সঙ্গে খুব সতর্কভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টরগুলো আসলে কীভাবে কাজ করে? বলা হয়ে থাকলেও, এগুলো শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে না। এটি মেশিন লার্নিং বা এমএল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে যা এআই এবং মানুষের লেখা টেক্সটের মধ্যে ভাষাগত এবং পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে থাকে। এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মূল বিষয়গুলো হলো ফ্রিকোয়েন্সি রেশিও, পার্টস অফ স্পিচ, সিলেবল বা শব্দাংশের প্রবাহ এবং হাইফেনের ব্যবহার। জেনে আসা যাক এগুলো কীভাবে কাজ করে। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে, এই টুলগুলো ফ্রিকোয়েন্সি রেশিও এর মাধ্যমে বিশাল ডেটাসেটের সঙ্গে ইনপুট করা কন্টেন্টের তুলনা করে এমন সব বাক্যাংশ বা ফ্রেজ খুঁজে বের করে, যা সাধারণত এআই-লিখিত লেখায় বেশি দেখা যায়। পার্টস অফ স্পিচ লেখার ব্যাকরণগত গঠন এবং সিনট্যাক্স বিশ্লেষণ করে এআই-এর মতো বা অন্য কোনো বিশেষ প্যাটার্ন আছে কি না তা যাচাই করে। সিলেবল বিশ্লেষণ পুরো টেক্সটজুড়ে সিলেবল বা শব্দাংশের ছন্দ এবং প্রবাহ পরীক্ষা করে। পরিশেষে এআই অনেক সময় যান্ত্রিকভাবে হাইফেন ব্যবহার করে, যা এই টুলগুলো সহজেই শনাক্ত করতে পারে।

শুধু শনাক্তকরণই নয়, এই প্রযুক্তিগুলো এখন আরও গভীরে গিয়ে কাজ করতে সক্ষম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেক্সট ডিটেক্টরগুলো ‘এআই লজিক’ নামক একটি প্রযুক্তির মাধ্যমে টেক্সট কেন এআই-জেনারেটেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার কারণ ব্যাখ্যা করে। ‘এআই ফ্রেজেস’ ডকুমেন্টের সেই অংশগুলোকে চিহ্নিত করে যা পরিসংখ্যানগতভাবে মানুষের চেয়ে এআই উৎস থেকে আসার সম্ভাবনাই বেশি। এ ছাড়া, ‘এআই সোর্স ম্যাচ’-এর মাধ্যমে এটি শনাক্ত করে যে টেক্সটের কোনো অংশ অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কি না, যে কোনো কন্টেন্ট বা সোশ্যাল মিডিয়া টেক্সটের সততা বা ইন্টিগ্রিটি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই টুলগুলো ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, পর্তুগিজ, রাশিয়ান, চাইনিজসহ আরও অনেক বেশি ভাষা সমর্থন করে। বিভিন্ন ভাষায় এর নির্ভুলতার হার অত্যন্ত চমৎকার; উদাহরণস্বরূপ, বেশ কিছু প্রচলিত টুলসের মাধ্যমে ইংরেজিতে এআই দ্বারা লেখা সনাক্তকরণে এর নির্ভুলতা ৯৫% এরও বেশি এবং স্প্যানিশ ভাষায় এআই লেখার ক্ষেত্রে ৯০% এরও বেশি নির্ভুলতা পাওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থী, লেখক এবং পেশাজীবীদের সুবিধার্থে এই ডিটেক্টরগুলো (যেমন কপিলিকস এআই ডিটেক্টর টুলস) ক্রোম এবং এজ ব্রাউজারে এক্সটেনশন হিসেবে, গুগল ডকস অ্যাড-অন হিসেবে এবং ক্যানভাস, মুডল বা ব্ল্যাক বোর্ডের মতো লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ব্যবহার করা যায়। কপিলিকস এ ব্যবহারকারীরা লগইন ছাড়াই ২৫,০০০ ক্যারেক্টার পর্যন্ত টেক্সট স্ক্যান করতে পারেন, যা অন্যান্য টুলের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধুমাত্র টেক্সট বা লেখার মধ্যেই এই জালিয়াতি সীমাবদ্ধ নেই। টেক্সট বা লেখার বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও এবং অডিওর জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বিতর্কিত রূপ হলো ‘ডিপফেক’। ডিপফেক হলো একটি এআই দিয়ে তৈরি করা মিডিয়া ফাইল, যেমন একটি ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং, যা দেখতে আসল বলে মনে হলেও আসলে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি এবং যার কোনো সত্যতা নেই। ডিপফেক শব্দটি প্রথম ২০১৭ সালের শেষের দিকে একজন রেডিট ব্যবহারকারী দ্বারা অনলাইন জগতে প্রবর্তিত হয়েছিল। ডিপফেক প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে তা বোঝা জরুরি। প্রথমে, এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এর বৃহৎ ভাষা মডেলগুলোকে বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলসকে প্রশিক্ষণ করার কাজটি সম্পন্ন হয়, যা ডিপ লার্নিং মডেল বা নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হাজার হাজার মানব বস্তুর ছবি এবং ভিডিওর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়। আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে যেসব ছবি বা ভিডিও পোস্ট করে থাকি, সেখান থেকে আমাদের চেহারা, কণ্ঠস্বর, গতিবিধি এবং কনটেন্টকে এই মডেলগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ ডেটা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ডিপফেকের কার্যপ্রণালিতে প্রধানত দুটি বিষয় দেখা যায়। প্রথমত, ভয়েস সংশ্লেষণ বা ভয়েস সিন্থেসিস, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কণ্ঠস্বরের ছন্দ, স্বর, গতি এবং বিরতির মতো অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে হুবহু নকল করতে শেখে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কণ্ঠস্বরে যে কোনো বক্তব্য তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ফেস সোয়াপিং বা মুখমণ্ডল পরিবর্তন, এই প্রযুক্তিতে একটি ভিডিও বা ছবিতে মানুষের মুখের বদলে অন্য একটি মুখের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। এআই মডেলটি মানুষের মুখের বৈশিষ্ট্য, ত্বকের রং, টোন এবং আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুখ অদলবদল করে এবং মুখের নড়াচড়া বা মুভমেন্ট সেটআপের মাধ্যমে নকল মুখকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করে। ডিপফেক প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজে এক ধরনের ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি হয়, যেখানে মানুষ সত্য ও মিথ্যার তফাৎ করতে পারে না। এরিক এন্ডারসন নামের একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, ডিপফেকের পেছনের মনোবিজ্ঞানের ধারণাটি হচ্ছে যে, ‘আমরা যা দেখি, আমাদের মন বা মস্তিস্ক তাই বিশ্বাস করে বা বিশ্বাস করতে চায়।’

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিপুল পরিমাণ ডিপফেক বা এআই জেনারেটেড কন্টেন্ট ছড়াচ্ছে কোথায়? এর মূল মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সোশ্যাল মিডিয়া একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় তথ্য সম্প্রচারের মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, যার বিস্তৃতি দেশ-মহাদেশের সীমানা অতিক্রম করে যেকোনো সময় যে কোনো গোষ্ঠীর কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে যেসব কনটেন্ট আমাদের সামনে আসে, তার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ কনটেন্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল অ্যালগরিদম দিয়ে তৈরি করা বলে ধারণা করা হয়। এই ফেক কন্টেন্টগুলোকে বৃহৎ পরিসরে দুইভাবে ভাগ করা যায়। একটি হলো মিসইনফরমেশন বা ভুল তথ্য যা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয় এবং এর পেছনে কোনো স্পষ্ট ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকে না। অসৎ উদ্দেশ্য না থাকা সত্ত্বেও ভুল তথ্য খুব সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যটি হলো ডিসইনফরমেশন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল তথ্য, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা ফেক কন্টেন্ট, যা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয় তাদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য। ‘Disinformation’ শব্দটি রাশিয়ান শব্দ ‘dezinformácija’ থেকে এসেছে এবং এটি বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে বিদ্বেষপূর্ণভাবে প্রচার করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো প্রায়শই এনগেজমেন্ট বা সম্পৃক্ততা সর্বাধিক করার জন্য কাজ করে, ফলে সেনসেশনাল বা চাঞ্চল্যকর ভুয়া খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এমআইটি-এর গবেষকদের ২০১৮ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে টুইটারে সঠিক তথ্যের চেয়ে মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ফেক কন্টেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে কিশোর-কিশোরীরা সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাকাউন্ট করতে পারবে না, যা ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এই উদ্যোগটি মূলত পরবর্তী প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রনের কথা চিন্তা করে নেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান সরকার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক এবং টুইটারকে মৌলিক সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ইউটিউবের কিছু কনটেন্ট রেস্ট্রিক্টেড রাখার ব্যবস্থা করেছে। ই-সেফটি কমিশন এই উদ্যোগটি চালু করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর জন্য ৪৯.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানার অপশন রাখা হয়েছে যদি তারা উপযুক্ত ফিচার ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট অনুমোদন করে। অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি উদ্যোগটি ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্তকরণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ অনলাইন অনুশীলন সম্পর্কে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্যও কাজ করে।

আইনি কাঠামোর পাশাপাশি প্রযুক্তির উন্নয়নের চাকাও থেমে নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে গুগলের সহায়ক প্রতিষ্ঠান ‘গুগল ডিপমাইন্ড’ একটি অগ্রণী নাম। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে গুগল অধিগ্রহণ করে এবং ২০২৩ সালে এটি ‘গুগল ব্রেন’-এর সঙ্গে একীভূত হয়। ডিপমাইন্ড ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’ নামের এক ধরনের মেশিন লার্নিং মেথড ব্যবহার করে, যা মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিকে অনুকরণ করতে সাহায্য করে। ডিপমাইন্ডের একটি অত্যন্ত পরিচিত অ্যাপ্লিকেশন হলো ‘জেমিনি’। জেমিনি শুরু থেকেই মাল্টিমোডাল হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যা টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিও এবং কোডজুড়ে বিষয়বস্তুকে নিজস্বভাবে বুঝতে এবং তৈরি করতে সক্ষম। জেমিনি কথোপকথনের সময় প্রসঙ্গ সচেতনতা বজায় রাখতে পারে, ব্যবহারকারীর কথার টোন বা স্বর বিশ্লেষণ করতে পারে এবং অপ্রাসঙ্গিক অডিওকে উপেক্ষা করতে পারে। এটি রিয়েল-টাইম যোগাযোগের নির্ভুলতা বাড়িয়ে দেয় এবং ডেভেলপাররা ‘গুগল এআই স্টুডিও’-তে জেমিনি এপিআই ব্যবহার করে ইন্টারেক্টিভ ইন্টারফেস তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের ভিড়ে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণে ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ভুয়া খবর এবং এআই-জেনারেটেড বিভ্রান্তি মোকাবিলার জন্য ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ বা সত্যতা যাচাইকরণ অত্যন্ত জরুরি। ফ্যাক্ট-চেকিং হলো যে কোনো প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়বস্তু, প্রতিবেদন বা বিবৃতির নির্ভুলতা এবং সত্যতা যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া। ২০১৬ সালের মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ব্রেক্সিট গণভোটের পর বিশ্বব্যাপী ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। বর্তমানে জেনারেটিভ এআই এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। এলএলএম যেমন দ্রুত মিথ্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি এটি অপপ্রচার শনাক্ত ও প্রতিরোধেও সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, ‘ফ্যাক্টবট’ স্নোপসের ৩০ বছরের আর্কাইভ রিয়েল-টাইমে অনুসন্ধান করে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে, ফ্যাক্ট-চেকিং মানুষের বিশ্বাসের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

বৈশ্বিক এই প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেক কন্টেন্ট এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঝুঁকি প্রবল। গ্রামীণফোনের মতে দেশে প্রায় ১২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে, যারা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন ধরনের ফেক কন্টেন্টের সম্মুখীন হতে পারে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রধান উপায়ে ডিপফেক বা ফেক কন্টেন্ট ব্যবহার করা হতে পারে। প্রথমত চরিত্র হনন, যেখানে কোনো প্রার্থীর চলাফেরা বা কর্মকাণ্ড নিয়ে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা হতে পারে, যা দেখাবে তিনি কোনো নিষিদ্ধ স্থানে গিয়েছেন বা খারাপ কাজ করেছেন। দ্বিতীয়ত দুর্নীতির অভিযোগ, যেখানে সংস্কারমূলক কাজের সময় প্রার্থীর কণ্ঠে নকল অডিও তৈরি করে প্রচার করা হতে পারে যে তিনি অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করছেন। তৃতীয়ত কেলেঙ্কারি সৃষ্টি, যেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশ্লীল বা অপ্রীতিকর ভিডিও তৈরি করে তাদের সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করার চেষ্টা করা হতে পারে।

এখন আসা যাক প্রযুক্তিগত প্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট উপায় বা মেকানিজম প্রসঙ্গে। এআই দ্বারা তৈরি জাল কনটেন্ট মোকাবিলায় সাধারণত রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং ব্যবহার করা হয়। এটি এক ধরনের মেশিন লার্নিং, যেখানে একটি এজেন্ট বা সিস্টেম ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ বা বারংবার চেষ্টা ও ভুলের মাধ্যমে পরিবেশ থেকে শেখে। এজেন্টটি ভালো কাজের জন্য ‘রিওয়ার্ড’ এবং ভুল কাজের জন্য ‘পেনাল্টি’ পায়, যা তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। এ ছাড়াও, সিএসআইআরও ডিপফেক ডিটেকশন রিসার্চ পরিচালনা করছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় একটি মূল্যায়ন কাঠামো প্রস্তাব করেছে। গবেষকরা ‘ডিপফেক ল্যাব’ এবং অন্যান্য ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডিপফেক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শিখছেন এবং উন্নত করছেন।

পরিশেষে, আগামীর বাংলাদেশ গঠনে এই প্রযুক্তিগত সচেতনতাই হবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্য ফ্যাক্ট-চেকিং এবং এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত, যারা আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে চায়। বিএনপির ৩১ দফার ৩০তম দফায় তরুণ সমাজকে এআই এবং সৃজনশীল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার কথা বলা হয়েছে। যদি বিএনপি দেশ পরিচালনার সুযোগ পায়, তবে তারা ডিপফেকসহ অন্যান্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করবে। নেতিবাচক এআই কন্টেন্ট মোকাবিলার জন্য তরুণ প্রজন্মকে ‘প্রতিরোধক এআই’ তৈরির শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই ফেক নিউজ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিপফেক প্রযুক্তি আমাদের সামনে যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি এর সমাধানও প্রযুক্তির হাতেই রয়েছে। সরকার, মিডিয়া কর্মী, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার এবং প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডিপমাইন্ড এবং জেমিনির মতো উন্নত এআই সিস্টেমগুলো মানবজাতির কল্যাণে এবং জটিল সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত হতে পারে, যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল এআই ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারি। আগামী দিনগুলোতে এআই শুধুমাত্র ফেক কন্টেন্ট তৈরির হাতিয়ার হবে না, বরং সত্যতা যাচাই এবং তথ্য বিজ্ঞানের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  ডিপফেক   ফেক কন্টেন্ট   সত্যের সন্ধান  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close