ছাত্রসংসদ গঠিত হয় এই প্রত্যাশা থেকে যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সহপাঠীদের অধিকার রক্ষা করবেন, তাদের কথা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেবেন এবং ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক শিক্ষা-পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটে চলেছে, তা এই প্রত্যাশার একেবারে বিপরীত।
কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে যে চিত্র বারবার সামনে আসছে, তাতে অধিকার রক্ষার বদলে ভয় ও দমনের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই ভীতির পরিবেশ তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খোদ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক নিজেই। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাটি নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘর্ষ নয়। প্রক্টর, শিক্ষক ও পুলিশের সামনেই পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, আহত এক শিক্ষার্থীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়েও মারধর করা হয়েছে। এমন ঘটনা যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চোখের সামনে ঘটে, তখন তা প্রশাসনিক ব্যর্থতার চেয়েও গভীর একটি সংকটের ইঙ্গিত দেয়—ক্যাম্পাসে আইনের শাসনের জায়গাটি কার্যত দখল করে নিয়েছে একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি।
গ্রন্থাগার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, জ্ঞানচর্চা ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক। সেই জায়গাতেই যদি শিক্ষার্থীরা মারধরের শিকার হন, আর সেই মারধরে সরাসরি অংশ নেন ছাত্রসংসদের শীর্ষ পদাধিকারীরা, তাহলে তা কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রশ্নও বটে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে যেভাবে হুমকি, মারধর ও আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা গেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন উত্তেজনার ফল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
এই ঘটনার পরের ধাপ আরও উদ্বেগজনক। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা বা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের বদলে ছাত্রসংসদের সহ-সভাপতি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, অভিযোগ তুলেছেন সংবাদ উপস্থাপনার ধরন নিয়ে। যে প্রতিষ্ঠানের কাজ হওয়ার কথা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যখন গণমাধ্যমকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে, তখন বোঝা যায়—সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির আচরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দাম্ভিকতায় পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকতা ক্যাম্পাসে জবাবদিহির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার; সেই হাতিয়ারকে ভোঁতা করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
অপরাধের বিচারের এখতিয়ার প্রশাসনের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, কোনো ছাত্রসংগঠন বা ছাত্রসংসদের নয়। এই সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে যে কোনো সংগঠনই ভবিষ্যতে নিজেদের ইচ্ছেমতো ‘বিচারক’ সাজার সুযোগ পাবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন যেভাবে সক্রিয় হয়েছে, তার মধ্যে জবাবদিহিহীনতার এই প্রবণতা একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। এর আগে রাকসুর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দীন আম্মারের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে গণপিটুনিতে নিহত হন রাবির সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের স্টোর অফিসার আবদুল্লাহ আল মাসুদ।
ছাত্ররাজনীতি যদি সন্ত্রাস ও ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তার মাশুল দিতে হবে গোটা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকেই। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জরুরি। গ্রন্থাগারে হামলার ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, প্রশাসনিক পদ বা সাংগঠনিক পরিচয় নির্বিশেষে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংগঠন ক্যাম্পাসে বলপ্রয়োগকে ‘স্বাভাবিক’ মনে না করে। সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব একচ্ছত্রভাবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে থাকতে হবে; কোনো ছাত্রসংগঠন বা ছাত্রসংসদকে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেওয়া যাবে না।
ছাত্রসংসদ যদি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তাহলে তার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে, ভীতির উৎস হিসেবে নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এখনই দৃঢ় ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ক্যাম্পাসে ‘মবতন্ত্র’ যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে যাচ্ছে, তার দায় এড়ানো কঠিন হবে।
কেকে/ এমএস