মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
সাহিত্য
‘অন দ্য রোড’
ফরহাদ নাইয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৮ পিএম আপডেট: ২৩.০১.২০২৬ ৬:২৮ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সবেমাত্র ছুটির ঘণ্টা পড়ল। কতক্ষণ ধরে এই শব্দের জন্য অপেক্ষা করছিলাম! পানির টাব থেকে হাতটি দ্রুত টেনে তুললাম। এখানে খালি বোতলগুলো স্তুপ করে রাখা, এগুলো আবার ক্লিন করে বিয়ার ভরতে হবে, তারপর সেগুলো শহরের বার আর নাইটক্লাবগুলোতে যাবে। সেখানে তৃষ্ণার্ত মানুষগুলো গলায় ঢালবে এই পানীয়, তারা এমনভাবে পান করবে যেন তাদের তৃষ্ণা কখনো মেটে না। একটু পরই সেগুলো আবার খালি হয়ে আমার কাছে ফিরে আসবে। আবার ক্লিন করতে হবে।

আমি অস্থির চোখে একটা ন্যাকড়া খুঁজতে লাগলাম। হাত দুটো দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভিজে কুঁচকে গেছে। এক এক করে আঙুলগুলো মুছতে গিয়ে নজর পড়ল যেখানে আমার আঙুলে একটা সোনার আংটির কথা ছিল। সারা জীবন একটা আংটির স্বপ্ন দেখেছি আমি—যে কোনো একটা আংটি হলেই হতো। গয়নার দোকানের জানলায় যেমনটা দেখতাম—টকটকে লাল পাথরের একটি আংটি। ডান হাতের অনামিকায় ওটা পরার খুব শখ ছিল আমার। একবার কিছু টাকা জমিয়ে নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে ওই লাল পাথরের সোনার আংটিটা কিনব। তখন জানতাম না যে বাবা মারা যাবেন, আর জমানো টাকাগুলো মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বাবার শোকে আমি আংটির কথা মাথা থেকেই ঝেড়ে ফেলব।

তবে এখন আমার একটা আংটি আছে: বাগদানের আংটি। একটা সাধারণ হলুদ ব্যান্ড, যা আমি আঙুলে পরি। ওটাই আমাকে দিয়েছিল যখন বলেছিল, ‘তুমি আমার স্ত্রী হবে।’ আমি তখন খুব খুশি হয়েছিলাম—ভাবলাম ওর ঘরনি হব, আর এই আংটিটা পরব। মনে মনে আশা ছিল এই হলুদ ব্যান্ডের সঙ্গে ও আমাকে লাল পাথর বসানো আরও একটি আংটি দেবে। কিন্তু দেয়নি। ও আমার মতোই গরিব, তাই এই আংটি, একটি নীল সিল্কের জামা আর একটি শিশি পারফিউম (যা আমি এখনও খুলিনি)—এর বেশি দেওয়ার সামর্থ্য ওর ছিল না।

আমি পকেট থেকে একটি ছোট চামড়ার ব্যাগ বের করে আংটিটা নিলাম। সাবান আর পানিতে আংটির জেল্লা নষ্ট হতে পারে, এই ভয়ে এটি লুকিয়ে রেখেছিলাম। আংটিটা পরে চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম, এখানে যারা কাজ করে তাদের সব মহিলারা চটপট নিজের ঘরে চলে গেছে। হয়তো তারা এখন কোনো গরম খাবার খাচ্ছে অথবা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। আমার পা দুটো ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, তবুও কারখানার গেটে অপেক্ষা করতে হবে। ও যদি কারখানার ট্রাকে আমাকে একটু লিফট দেয়! এই বৃষ্টিভেজা কনকনে রাতে হেঁটে শহরে ফেরার কথা ভাবতেই পারছি না। হ্যাঁ, ও নিশ্চয় আমাকে তুলে নেবে, সঙ্গে থাকবে বিয়ার ক্রেটগুলো। ও আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে তারপর বিয়ার ডেলিভারি করতে বেরোবে। আমি অপেক্ষা করবই। আমি খুব ক্লান্ত, আজ সকালে অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি।

সকালে আসার পথে কত কিছু দেখলাম: বন্ধ জানালার বাড়িঘর, আধো-ঘুমে বিভোর মানুষরা কাজে যাচ্ছে। দেখলাম মহিলারা ডিম আর দুধ বিক্রি করছে, বাড়ির চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। আর আমি শুধু হাঁটলাম। এতটা পথ হেঁটে এখানে আসতে হয়েছে যে মনে হয় কারখানার মালিক দুনিয়ার শেষ প্রান্তে ফ্যাক্টরি বানিয়েছেন। ছোটবেলায় দেখা সেই ট্রেনের কথা মনে পড়ল, যা দেখে সবসময় মনে হতো ওটা অসীম কোনো সফরে যাচ্ছে, একদম পৃথিবীর শেষ সীমানায়। আমি কারখানার অন্য মহিলাদের সঙ্গেও পৌঁছালাম, কিন্তু আমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়েছিল তাদের অন্তত এক ঘণ্টা আগে। আমার বাড়ি শহরের অনেক পুরোনো এক এলাকায়। সেখানেই আমার জন্ম, সেখানেই বড় হওয়া, আর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকব।

হ্যাঁ, আমার বিয়ে হচ্ছে! আমার হাতে আংটি আছে, আর আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে তার নিজের ঘরে নিয়ে যাবে। আমি তখন রানীর মতো থাকব—আর কখনো বোতল ধুতে হবে না, মোরগ ডাকার আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে না, আর কারখানায় আসা-যাওয়ার পথে পা ফেটে রক্ত ঝরবে না। আমার মানুষটা গরিব হতে পারে, কিন্তু খুব শক্তপোক্ত আর দয়ালু। ওর পাশে থাকলে আমাকেও শক্তিশালী দেখাবে, তখন আর নিজেকে ছোট মনে হবে না। এখন ওই দামী পারফিউম মাখা সুবেশা মহিলারা পাশ দিয়ে গেলে যেমনটা লাগে, তেমন আর লাগবে না। ও যে নীল জামা দিয়েছে, সেটা খুব সুন্দর, বলেছে আরও একটি কিনে দেবে। আর ও—ও খুব সুন্দর আর হ্যান্ডসাম, ফ্যাক্টরির মেয়েরা অন্তত তাই বলে। অনেকে হিংসাও করত, আবার কেউ কেউ শুভকামনা জানিয়েছিল: ‘যাক, অন্তত এই খাটুনি থেকে তোর মুক্তি মিলবে,’—এনগেজমেন্টের দিন বলেছিল ওরা।

এক ধূর্ত মেয়ে বলল, ‘তুমি খুব চতুর শিকারি, কারখানায় ঢোকার দুই মাসের মাথায় একজন কর্মীকে পটিয়ে ফেলেছ!’ আমি সেটা শুনেছিলাম, কিন্তু ওর ওপর রাগ করিনি। হয়তো ও নিজেও চাইছিল এমন কেউ আসুক যে ওর কাঁধ থেকে জীবনের ভার কিছুটা কমাবে। ওর এই চাওয়াটা কি খুব অন্যায়? আমরা কেন ওই বিলাসী মহিলাদের মতো হতে পারি না, যারা বারান্দায় বসে কফি আর গালগল্পে মেতে থাকে? যারা চিকচিক করা আংটি পরা ফর্সা হাত দিয়ে কফির কাপ মুখে তোলে, আর আমরা যখন পুরনো জামা পরে হেঁটে যাই, তখন আমাদের দেখে হাসাহাসি করে?

রাস্তা এখন জনমানবশূন্য। চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। আমার মাথায় জড়ানো পশমি স্কার্ফের ওপর টুপটুপ বৃষ্টি পড়ছে। ওর সেই ট্রাকটা এখনো আসছে না কেন? কেন দেরি হচ্ছে? ও কি আগে কারখানা থেকে বেরিয়ে গেছে? মানুষের ভিড় আর মেশিনের শোরগোলের মধ্যে আমি কি ওকে চলে যেতে দেখিনি? ভয় হতে শুরু করল। সামনে দীর্ঘ রাস্তা, সেই পুরোনো বাড়ি যেখানে রুপালি চুলের মা আর চুলার ওপর গরম স্যুপ নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। খিদেও লেগেছে খুব, মায়ের জন্য আর ওর জন্য খুব মন কেমন করছে। আমরা তিনজন আগুনের পাশে বসে এমন সব গল্প করব যার সঙ্গে বিয়ারের বোতল বা কারখানার ধোঁয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। ও কি আমাকে না দেখেই চলে গেল?

হঠাৎ গাড়ির শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙল। হয়তো ও-ই আসছে? দূর থেকে দুটি জ্বলজ্বলে আলো দেখা গেল, তারপর ধীরে ধীরে কাছে এল। না, এটা সেই খটখটে আওয়াজ করা বড় ট্রাক নয়। এটা বড়লোকের দামি গাড়ি, খুব মসৃণভাবে চলছে। কিন্তু গাড়িটা থামছে না কেন? ও নিশ্চয় আমাকে দেখেছে—গাড়ির হেডলাইট অন্ধকার ভেদ করে আমার ওপর পড়েছিল, আমি তো প্রায় রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। গাড়িটা যখন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, আমি চিৎকার করে উঠলাম যাতে ও থামে। আমি দৌড়ে গেলাম, ও দরজা খুলে দিল। কিন্তু ঠিক তখনই একটি বিশ্রী দৃষ্টি আমাকে থমকে দিল। কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে দুটো কুৎসিত চোখ আমার দিকে চেয়ে আছে। কে এই লোকটা? আমি জানি না! হয়তো ম্যানেজার, যার নামই শুধু শুনেছি। অস্থিরভাবে নড়েচড়ে বসে উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে এই আপদ?’ আর কিছু না বলে হাতের দামি চুরুটটা নেড়ে আমাকে সরে যেতে ইশারা করলেন।

আর আমার সেই ভালোবাসার মানুষটি কী করল- যে আমাকে কাছে টেনে বলেছিল, ‘তুমি আমার স্ত্রী হবে’ সে আমাকে দরজা থেকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে মুখের ওপর ধড়াস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

গাড়িটা চলে গেল, আমাকে ঝড়ের মধ্যে একা ফেলে রেখে। রাগে-ক্ষোভে আমার চোখ দিয়ে গরম জল গড়িয়ে পড়ল, আর একটি তীব্র ঘৃণা আমাকে ঘিরে ধরল। আমার চোখের সামনে সব ছবি যেন বদলে যেতে লাগল। দুনিয়ার সবকিছু এখন অনেক বিশাল, ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে হচ্ছে। ঘরবাড়ি, মানুষ, গাছপালা, গাড়ি—সবই যেন দানবের মতো বিশাল। এমনকি সেই খালি বিয়ারের বোতলগুলোও এখন আমার কাছে দানবের মতো উঁচু মনে হচ্ছে। আর এই বিশাল জিনিসের মাঝখানে আমি নিজেকে আর ওকে দেখলাম। আমরা যেন খুব তুচ্ছ দুটো মানুষ, মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণী। আমরা যত উঁচুই হই না কেন, সেই ম্যানেজারের আঙুল পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতাও আমাদের নেই—যেই আঙুলের এক ইশারায় আমাকে গাড়ি থেকে সরিয়ে ঝড়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো।

----------------------------------------

সামিরা আজম (১৯২৭–১৯৬৭) ফিলিস্তিনের একর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাত্র ১৬ বছর বয়সে শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কৈশোরেই ‘ফাতাত আল-সাহেল’ ছদ্মনামে তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে বাধ্য হয়ে সপরিবারে লেবাননে চলে যান। তিনি একাধারে সাংবাদিক, ছোটগল্পকার এবং বিখ্যাত ইংরেজি ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদক ছিলেন।

মূল: সামিরা আজম

অনুবাদ: ফরহাদ নাইয়া

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  সাহিত্য   রোড   জনমানবশূন্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

সাহিত্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close