মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: পদ্মা সেতুতে তিন হাজার ৪০০ কোটি টাকার টোল আদায়      কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা মামলায় ইনুর ১০ বছরের জেল      শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আছে: তথ্য উপদেষ্টা      তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা চায় বাংলাদেশ: ডা. জাহেদ      বুধবার ‘ব্যাংক হলিডে’, বন্ধ থাকবে লেনদেন      বকেয়াসহ জুলাই থেকে বেতন পাবেন মাদ্রাসা শিক্ষকরা: শিক্ষামন্ত্রী      শপথ নিতে পারবেন না আসলাম চৌধুরী      
সাহিত্য
‘আছাব বানু’ : একটি সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক সফর
আবু বকর মু. মুঈনউদ্দিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৭:৫৩ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

ফয়েজ আলম কবি ও উত্তরউপনিবেশি তাত্ত্বিক হিসাবেই খ্যাতিমান। তবে তার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘আছাব বানু’ পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি কথা সাহিত্যেও দুর্দান্ত। আখ্যান উপস্থাপন, চরিত্র রূপায়ন, ভাষা, সংলাপ, অন্তস্থ বক্তব্য—সবদিক বিবেচনায় বলব ‘আছাব বানু’ বাংলা কথাসাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। 

আছাব বানু’ আসলে আর দশটা উপন্যাসের মতো কোনো সাধারণ ধাঁচের উপন্যাস না। এটি একধরনের উত্তরউপনিবেশি দার্শনিক প্রতিরোধ, যেখানে ভাষা, ধর্ম, সমাজ ও মানুষের অস্তিত্ব সবকিছু একসঙ্গে পুনর্বিবেচিত হয়। উপনিবেশি আমলে বদলে যাওয়া ভাষা ও চিন্তার কাঠামো আমাদের যে মানসিক বন্দিত্বে আটকে রেখেছে, এই উপন্যাস পহেলা আঘাত করে সেই জায়গাতেই। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের তৎপরতায় বানানো পোশাকী প্রমিত বাংলার বদলে এই উপন্যাস কথা বলে সাধারণ মানুষের ভাষায়, জনমানুষের প্রতিদিনের বুলিতে। এই ভাষায় লেখা উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে শুরুতে অস্বস্তি লাগতে পারে, কারণ আমাদের চিন্তার ভিতটাই উপনিবেশি চিন্তা ও ভাষার ছাঁচে গড়া। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরে পাঠক নিজের অজান্তেই এই ভাষার তাললয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিবেন। তার মনে হবে, আরে, এটিই তো আসল বাংলা ভাষা, এটিই তো অজস্ত্র মানুষের চিন্তার আর বেঁচে থাকার ভাষা। আমি বলতে চাচ্ছি ‘আছাব বানু’ উপন্যাসের ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না, বরং এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তিও।

উপন্যাসটি সামাজিক ও ধর্মীয় ট্যাবু ভেঙে ফেলে, কিন্তু এজন্য ধর্মকে প্রতিপক্ষ বানাতে হয় না, বরং ধর্মের সামাজিক তাফসির পুনঃপাঠের মধ্য দিয়ে পুনরায় পাঠ করে গোটা সমাজকেও। উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মোস্তারা বেগমের উক্তি, ‘হিন্দু মুসলমান যাই হোক, মানুষ তো!’ এই এক লাইনের মধ্যেই ধর্মীয় পরিচয়ের ওপরে মানবিকতার দার্শনিক অবস্থান দাঁড়িয়ে যায়। এখানে ধর্ম কোনো বিভাজনের যন্ত্র না, বরং এক ধরনের অন্তর্নিহিত নৈতিক বোধ, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বামপন্থি ও ইউরোপীয় আধুনিকতার সেই সরলীকৃত ‘ধর্ম বনাম প্রগতি’ দ্বন্দ্বকে ভেঙে দিয়ে দেখায় সমস্যা ধর্মে না, বরং তার সামাজিক তাফসিরে, ক্ষমতা-কাঠামো কর্তৃক তার ব্যবহারে। উপন্যাসটিতে এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ধর্মের সামাজিক তাফসিরের এক ধরনের পুনঃপাঠও হাজির করা হয়েছে।  

আছাব বানুর চরিত্রটি নিজেই এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সফর। ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে নিজ পরিবার তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, দূরে ফসলি খেতের আইলে একটা ছাপড়া বানিয়ে ওখানে রেখে আসে তাকে। স্বামী ও আত্মীয়স্বজন কর্তৃক তাকে বর্জনের বিষয় এবং এর পরের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সে এক নতুন আত্ম-উপলব্ধি খুঁজে পায়। গুটি বসন্তে আক্রান্ত আছাব বানুকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া কেবল ঘর থেকে বের করে দেওয়া না, বরং ‘অপর’ বানিয়ে দেওয়ার একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। এ অবস্থায় সে নিজের ভিন্ন পথ বেছে নেয়। দূরে কোথাও গিয়ে শান্তিতে মরার জন্য অন্ধকার রাতে অজানার পথে বের হয়ে যায়। কিন্তু মরে না, বেঁচে থাকে। দূরবর্তী অঞ্চলের এক গ্রামের জনৈক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মোস্তারা বেগমের সহযোগিতায় শিকড়-ডালপালা মেলে প্রবলভাবে বেঁচে থাকে। সে পরিণত হয় স্বাধীন মানুষে। ধর্মের মধ্যে থেকেও ধর্মের সামাজিক তাফসির অমান্য করে, রোজা রেখেও বিড়ি খায়। সমাজের ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, পুরুষ মানুষের সঙ্গে মিলে হাওড়ে কাজ করে। আবার দিনশেষে নিজের মুখোমুখি বসে আল্লাহকে চেনার চেষ্টা করে। কোনো কোনো দিন জিকিরে মশুগুল হয়, কোনো কোনো দিন দিল-ফানা করা মুর্শিদী গানে। এক আত্মসচেতন, বিপ্লবী, দুর্দান্ত নারী চরিত্রের আত্মপ্রকাশ। 

নিজ মেয়ে কার্তিকাকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে সংঘাত মামলা-মোকদ্দমায় পিছপা হয় না আছাব বানু। শেষ পর্যন্ত ডিভোর্স নিয়ে মেয়েকে কাছে রাখার অধিকার লাভ করে সে। সামাজিক ক্ষমতাকাঠামো, পুরুষতান্ত্রিকতা, ধর্মের ব্যক্তিক সুবিধাজনক তাফসির—এ সমস্ত কিছুর সঙ্গে লড়াই করে জীবনের পূর্ণতার দিকে এগোয় সে। এরমধ্যে আলাউদ্দিন নামের এক বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে সমাজ নিষিদ্ধ প্রেম ও শারিরীক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই সম্পর্ককে সে পাপ বা নিষিদ্ধ ভাবে না, বরং ব্যক্তিক পছন্দের বিষয় মনে করে। কিন্তু যখনই সে আলাউদ্দিনের স্ত্রীর ভয়াবহ মনোকষ্টের কথা জানতে পারে তখনই সে মানবিক দায়বোধে তাড়িত হয়ে এ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসে। ফলে তার জীবন প্রায় শূন্যতায় পর্যবসিত হয়। এরকম দু:সময়ে গৃহী বৈষ্ণবী বিধবা সুন্দরী দিদির সঙ্গে এক আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। প্রথম জীবনে স্বামী-সংসার কর্তৃক তাকে বর্জন, আবার সংসার গড়ে তোলা, বৈরি চারপাশের সঙ্গে অনবরত লড়াই, পাশাপাশি নিজস্ব বুঝের মধ্যে খোদায়ী চিন্তা তাকে উপন্যাসের শেষে জীবন সম্পর্কে এমন এক উপলব্ধির দিকে ঠেলে দেয় যা আর দশটা সাধারণ মানুষের বুঝের মতো নয়। এর ফলে ‘আছাব বানু’ উপন্যাসের পরিণতিও হয়ে উঠে ‘অসাধারণ’ ও অপ্রচলিত ধরনের। এই জায়গায় এসে উপন্যাসটি দেখায়, মানুষ শুধু সামাজিক ও ক্ষমতাকাঠামোর নির্জীব শিকার হয়ে থাকে না, বরং ভেতরের শক্তিতে লড়াই করে নতুন অস্তিত্ব নির্মাণ করতে পারে।

ধর্ম, সমাজ কাঠামো ও লোকজ জ্ঞান

‘আছাব বানু’ উপন্যাসের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ বাংলার তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, মাজার—এসব চর্চা লেখক কুসংস্কার হিসেবে বাতিল করেন না, আবার অন্ধভাবে মহিমান্বিতও করেন না। বরং এগুলোকে দেখান মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে যেখানে বিশ্বাস, চিকিৎসা, আধ্যাত্মিকতা সব একসঙ্গে মানবিক জীবনের মধ্যে মিশে থাকে। আছাব বানু ও তার সমাজনিষিদ্ধ প্রেমিক আলাউদ্দিনের  সংলাপে ‘আল্লাহ কই?’ ‘মানুষের ভিতরেই আল্লাহ’—এই যে মারফতি দৃষ্টিভঙ্গি, এটা আসলে বাংলার জনসমাজের আধ্যাত্মিক দর্শনের এক গভীর প্রকাশ, যেখানে ঈশ্বর কোনো বাহ্যিক সত্তা না, বরং মানুষের ভেতরের নৈতিক ও চৈতন্যগত উপস্থিতি।

‘আছাব বানু’ প্রমাণ করে গল্প মানে শুধু মনোরঞ্জক কাহিনী বলা না; গল্প মানে মানুষের অভিজ্ঞতার স্তরগুলোকে উন্মোচন করা। এ উপন্যাসে কোনো আইডিয়ার ওপর ‘বানানো’ হয়নি, ওখানে কোনো আরোপিত আইডিয়া নেই, চরিত্র নিজের মতো করে বেড়ে ওঠে। যা বড় উপন্যাসের অন্যতম  বৈশিষ্ট্য। এই উপন্যাস বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শুধু তুলে ধরে না, বরং তার ভেতরের দ্বন্দ্ব, দুর্বলতা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে। ফলে এটি শুধু সাহিত্য নয়, এটি একটি দার্শনিক দলিল, যা আমাদের শেখায় নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি ও নিজের অভিজ্ঞতার ভেতরেই মুক্তির পথ লুকিয়ে থাকে।

বাংলা সমাজে ধর্ম একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো, যা শুধু আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং আচরণ, নৈতিকতা ও সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে। সাধারণত সাহিত্যিক আলোচনায় ধর্মকে অনেক সময় সামাজিক ট্যাবুর উৎস হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু আলোচ্য উপন্যাসের বিশেষত্ব হলো এটি ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায় না।

এখানে ধর্মকে দেখা হয় একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া হিসেবে, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং বিভিন্ন সামাজিক শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। ধর্মের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক প্রয়োগের মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি হয় এবং এই ফাঁকই জন্ম দেয় ট্যাবুর। ফলে সমস্যা ধর্মে নয়, বরং ধর্মের ব্যাখ্যা ও সামাজিক ব্যবহারিক প্রয়োগে।

বাংলার সংস্কৃতিকে এই উপন্যাসে কোনো স্থির ঐতিহ্য হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে নিরন্তর সংলাপ ঘটে। রেমন্ড উইলিয়ামস সংস্কৃতিকে এ  হোল ওয়ে অফ লাইফ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই উপন্যাস পড়লে মনে হবে রেমন্ড উইলিয়ামসের ধারণা সঠিক, সংস্কৃতি আসলে গোটা একটা জীবনযাপন প্রক্রিয়াই। এখানে সংস্কৃতি শুধু উৎসব, আচার বা ঐতিহ্য না; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, এবং বিশ্বাসের সমষ্টি যার মধ্যে সে বেঁচে থাকে।

লোকজ জ্ঞান এই সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই জ্ঞান অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকে, কিন্তু মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। উপন্যাসে এই লোকজ জ্ঞানকে অবমূল্যায়ন করা হয়নি; বরং এটিকে জ্ঞানের একটি বিকল্প উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে। দার্শনিকভাবে এটি  জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। উপন্যাসটি প্রশ্ন তোলে জ্ঞান কি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক, নাকি অভিজ্ঞতাভিত্তিক জ্ঞানও সমান গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের মাধ্যমে এটি আধিপত্যশীল জ্ঞানের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে।

ভাষা, ক্ষমতা ও সাহিত্যিক নবজাগরণ

ভাষা এই উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। প্রচলিত সাহিত্যে ব্যবহৃত প্রমিত ভাষা অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এই উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষা বাংলাদেশের সর্বাঞ্চলীয় কথ্য ভাষা, সাধারণ মানুষের ভাষা। এই ভাষা আমাদের সমাজের শ্রেণিভিত্তিক বিভাজনকে ভেঙে দেয়।

নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ভাষাকে সাংস্কৃতিক মুক্তির মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। এই উপন্যাসেও ভাষা হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের হাতিয়ার। এটি দেখায়, যে ভাষায় মানুষ বাঁচে, সেই ভাষাই সাহিত্যকে জীবন্ত করে তোলে। সামাজিক আচারের দিক থেকে ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভাষার মাধ্যমে আমরা বাস্তবতাকে বুঝি এবং ব্যাখ্যা করি। এই উপন্যাস ভাষার মাধ্যমে সেই বাস্তবতাকে পুনর্গঠন করে। এই ভাষাগত পরিবর্তনকে একটি নবজাগরণ বলা যায়, কারণ এটি সাহিত্যকে আভিজাত্যের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসে।

চরিত্র, স্বাধীনতা ও দার্শনিক তাৎপর্য

‘আছাব বানু’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো কোনো পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে বন্দি না। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হয়েছে। তাদের আচরণও অনেক সময় অপ্রত্যাশিত। দার্শনিকভাবে এটি অস্তিত্ববাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। সার্ত্রের মতে, মানুষ প্রথমে অস্তিত্ব লাভ করে, তারপর নিজের পরিচয় তৈরি করে। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোও ঠিক তেমন, তারা নিজেদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তোলে।

এই চরিত্রগুলো নিখুঁত না; তারা দ্বন্দ্বে ভোগে, ভুল করে, আবার শিখে। এই অসম্পূর্ণতাই তাদের বাস্তব করে তোলে। লেখক তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন না; বরং তাদের বিকাশের জন্য একটি পরিসর তৈরি করেন, সেইখানে বিকশিত হয়েছে তারা, যেন আমাদের চারপাশের সমাজের কিছু বাস্তব মানুষ। এই পদ্ধতিকে অর্গানিক ন্যারেটিভ বলা যায়, যেখানে গল্পটি পূর্বনির্ধারিত না হয়ে চরিত্রের মাধ্যমে বিকশিত হয়।

দার্শনিকভাবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, মানুষ কি স্বাধীন? উপন্যাসটি সরাসরি উত্তর দেয় ‘না’, কিন্তু এটি দেখায় যে মানুষের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ হলেও তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত না। এই সীমাবদ্ধ স্বাধীনতাই মানুষের অস্তিত্বের মূল বৈশিষ্ট্য। এই উপন্যাস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে- সমাজকে বোঝা ছাড়া তাকে পরিবর্তন করা সম্ভব না। ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক ক্ষমতাকাঠামো- এ সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে মানুষের জীবনকে বিকাশের দিকে নিয়ে যায়।

আমাদের কথাসাহিত্যে একরকম দুর্দিন চলছে অনেক কাল থেকে। কয়েক দশক ধরে দেদারসে মনোরঞ্জক কথাশিল্প চর্চার কারণে এ সংকট আরও প্রকট হয়ে চোখে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ‘আছাব বানু’ উপন্যাসটিকে কোন মানদণ্ডে ও মানে দেখব আমরা সে প্রশ্নটিও জরুরি। এই বিচারে নিদ্বির্ধায় বলা যায় আছাব বানু বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি স্বতন্ত্র উচ্চতা তৈরি করেছে। কারণ এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শ চাপিয়ে না দিয়ে চরিত্র, ভাষা ও জীবনঅভিজ্ঞতার ভেতর থেকে নিজস্ব দর্শন নির্মাণ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যারয়র শক্তিশালী চরিত্র নির্মাণের ঐতিহ্য যেমন হোসেন মিয়ার মতো জটিল চরিত্রে দেখা যায়, তেমনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রাজনৈতিক-সামাজিক বয়ানে চরিত্র প্রায়ই বৃহত্তর আইডিয়ার বাহক হয়ে ওঠে, আর শহিদুল জহিরের লেখায় দেখা যায় তীব্র রাজনৈতিক-দার্শনিক টানাপড়েন। কিন্তু আছাব বানুর বৈশিষ্ট্য হলো এখানে চরিত্রকে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের বাহন বানানো হয়নি; বরং চরিত্র নিজস্ব অভিজ্ঞতা, দ্বন্দ্ব, ভুল ও আত্ম-উপলব্ধির ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়। এই উপন্যাসে ভাষার ব্যবহার, সামাজিক ট্যাবুর পুনঃপাঠ, ধর্মীয় ব্যাখ্যার মানবিকীকরণ এবং লোকজ সংস্কৃতির গভীর স্বীকৃতির মাধ্যমে এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তির প্রস্তাব রাখে। ফলে এটি শুধু একটি গল্প নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সমাজ-সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান যা বাংলা কথাসাহিত্যে ‘আছাব বানু’ উপন্যাসটিকে এক অনন্য ও শক্তিশালী অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে।

এই উপন্যাস কোনো চূড়ান্ত সমাধান দেয় না; বরং এটি প্রশ্ন তোলে, চিন্তা উসকে দেয় এবং পাঠককে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। এই দিক থেকে ‘আছাব বানু’ উপন্যাস একটি সাহিত্যকর্মের চেয়েও বেশি—এটি একটি দার্শনিক ও সামাজিক অনুসন্ধান। এর চরিত্রগুলোর ভাষা, চিন্তাকাঠামো, মানবিকতা, অধ্যাত্মবোধ—সবই বাংলাদেশের জনমানুষের বাস্তব যাপনের নির্যাস। এখানে ইউরোপকেন্দ্রিক আধুনিক মনস্তত্ত্বের কৃত্রিম রূপায়ন হাজির করা হয়নি, যা মূলত উপনিবেশি চিন্তাকাঠামোর প্রভাবের ফসল। তাই ফয়েজ আলমের ‘আছাব বানু’ উপন্যাসটিকে আমি আছাব বানু নামের এক বিপ্লবী নারীর উত্তরউপনিবেশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক সফর হিসাবেও দেখি। 

‘আছাব বানু’ উপন্যাস আমাদের শেখায় পরিবর্তন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এটি ভেতর থেকে তৈরি করতে হয়। আর সেই প্রক্রিয়ার শুরু হয় প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে, জীবনের বাস্তব যাপন, ধারাবাহিক উত্তরাধিকার আর চারপাশকে বুঝার মধ্য দিয়ে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আছাব বানু   সাংস্কৃতিক   দার্শনিক সফর   আবু বকর মু. মুঈনউদ্দিন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

সাহিত্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close