বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম: রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় রোববার      যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা      নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে সতর্কবার্তা আলজেরিয়ার      হিজবুল্লাহর হামলা বন্ধের শর্তে লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইসরায়েল      গণঅভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আ. লীগের আপত্তি, পাল্টা জবাব জাতিসংঘের      দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে মেতেছে একটি দল : মির্জা ফখরুল      মায়ের গলিত লাশ উদ্ধার : যুগ্ম সচিব ছেলেকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার      
সাহিত্য
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ভিত্তি
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৩:১৭ পিএম

১৯৭৫ সালের পরবর্তী বাংলাদেশ যখন এক গভীর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে। যা হোক, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এবং ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি কার্যকর ও আত্মবিশ্বাসী রূপ দেওয়ার জন্য তিনি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেন। তার শাসনামলের (১৯৭৭-১৯৮১) উন্নয়নমুখী রাজনীতির অন্যতম প্রধান দলিল ছিল তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি (১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল)। 

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এই কর্মসূচিতে তিনি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। দেশের দীর্ঘমেয়াদি আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ যে অপরিহার্য, তা জিয়াউর রহমান গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। 

বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সামাজিক কল্যাণ ও দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুতকরণের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি তার উন্নয়ন দর্শনে সুস্পষ্ট ছিল। এ বাস্তবমুখী চিন্তাধারারই ফসল হিসেবে তিনি মহাকাশ গবেষণা, শিল্প ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, আধুনিক টেলিযোগাযোগ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এবং কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য আবহাওয়া পূর্বাভাস, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ফসলের নিবিড়তা পর্যবেক্ষণ এবং ভূমি জরিপে আধুনিক মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জরুরি। স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় চিত্র প্রেরণ (অচঞ) গ্রাউন্ড স্টেশন এবং ১৯৭২ সালে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার সহযোগিতায় চালু হওয়া আর্থ রিসোর্সেস টেকনোলজি স্যাটেলাইট (ইআরটিএস) প্রোগ্রামকে সমন্বিত রূপ দিতে কাজ শুরু করে তৎকালীন সরকার। ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ ল্যান্ডস্যাট প্রোগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ জরিপ ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

এ ধারাবাহিকতায় দেশের মহাকাশ গবেষণাকে একটি স্থায়ী ও বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৮০ সালের ২৬ নভেম্বর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের একটি সরকারি আদেশবলে (অর্ডার নম্বর : এসটিডি (এস-১/২১-৩১/৮০)) বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশনের স্পেস অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক রিসার্চ সেন্টার (এসএআরসি) এবং বাংলাদেশ ল্যান্ডস্যাট প্রোগ্রামকে একীভূত করা হয়। এর মাধ্যমেই জন্ম নেয় স্বায়ত্তশাসিত মহাকাশ সংস্থা ‘বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান’ বা স্পারসো। স্পারসো প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশে মহাকাশ বিজ্ঞান, দূর অনুধাবন এবং ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) চর্চার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে বন্যা কবলিত অঞ্চলের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি, উপকূলীয় ক্ষয়প্রাপ্ত অঞ্চল পর্যবেক্ষণ, দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অবস্থা নিরূপণ, বঙ্গোপসাগরের গভীরতম মৎস্য অঞ্চল চিহ্নিতকরণ এবং নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করে। এ ছাড়া নাসা, জাপানের জাক্সা এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার  সঙ্গে সমন্বিত বৈজ্ঞানিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্পারসো বাংলাদেশের প্রথম মহাকাশ কেন্দ্র হিসেবে শান্তিপূর্ণ মহাকাশ গবেষণার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে একটি কেবিনেট রেজুলেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) তার কার্যক্রম শুরু করলেও এর প্রশাসনিক ও গবেষণামূলক গতিশীলতা বাড়ানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ কাঁচামালের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করতে বিজ্ঞানীদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের উদ্দেশ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকার ১৯৭৮ সালে একটি ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি করে, যা ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮’ নামে পরিচিত। 
শহীদ প্রেসিডেন্ট আইনি সংস্কারের পাশাপাশি এসময় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অবকাঠামোগত প্রসারে ব্যাপক বাজেট বরাদ্দ রেখেছিলেন। তার শাসন আমলে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত মেকানিক্স ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালের জুলাই থেকে ১৯৮০ সালের জুনের মধ্যে বিসিএসআইআর-এর অধীনে ‘সূক্ষ্ম মেকানিক্স, ইলেকট্রনিক্স ও ইনস্ট্রুমেনটেশন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প জ্বালানি ও গ্রামীণ শক্তির চাহিদা মেটাতে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে ‘এনার্জি অ্যান্ড ফুয়েল রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (আইএফআরডি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ইনস্টিটিউটের প্রধান লক্ষ্য ছিল বায়োগ্যাস প্রযুক্তি, উন্নত চুলা এবং সৌর শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও তৃণমূল পর্যায়ে এর সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করা। রাজশাহীর আঞ্চলিক ল্যাবরেটরিতে ১৯৭৬ সালে যুক্ত হওয়া ফল প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ গবেষণা বিভাগ উত্তরবঙ্গের কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তিগত রূপান্তরে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করে।

একটি উন্নয়নশীল দেশের আধুনিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে যুগোপযোগী করতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকারের শাসনামলে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার সম্পন্ন হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালে ‘দ্য বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯’ জারি করার মাধ্যমে দেশের তার ও টেলিফোন ব্যবস্থাকে সুসংহত করে ‘বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ড’ (বিটিটিবি) গঠন করা হয়। বিটিটিবি প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটি সুসংহত ও কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে এনে আধুনিক টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট সংযোগের জন্য প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করা হয়। যা পরবর্তী সময়ে দেশের সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক ও আধুনিক ইন্টারনেট সেবা চালুর পথ সুগম করেছিল। এরই সমান্তরালে, দেশে কম্পিউটিং সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ও আইটি খাতের প্রসারে ১৯৭৯ সালে ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি’ (বিসিএস) প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার মোহাম্মদ হানিফ উদ্দিন মিয়াসহ দেশের অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীদের কাজের স্বীকৃতি এবং কম্পিউটার ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে এই পেশাদার প্ল্যাটফর্মটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

জিয়াউর রহমানের প্রযুক্তিগত চিন্তাভাবনা কেবল শহুরে গবেষণাগার বা উচ্চতর তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সরাসরি দেশের সর্ববৃহৎ খাত কৃষিতে প্রযুক্তির সফল প্রয়োগে নিবেদিত ছিল। ১৯৭৬ সালে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী থেকে শুরু হওয়া উলাশী-যদুনাতপুর খাল খনন ও জলপথ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি ছিল মূলত গ্রামীণ পানি ব্যবস্থাপনা ও সেচ প্রযুক্তি প্রয়োগের এক সফল রূপ। এ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্প খরচে এবং স্থানীয় জনসম্পৃক্ততার সঙ্গে যান্ত্রিক ও কায়িক প্রযুক্তির চমৎকার সমন্বয়ে পানি নিষ্কাশন ও সেচ সম্প্রসারণের এক অনন্য কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যা পরবর্তীতে দেশব্যাপী ‘খাল খনন কর্মসূচি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উন্নত সেচ প্রযুক্তি, রাসায়নিক সারের সঠিক ব্যবহার এবং উচ্চ ফলনশীল বীজের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে একফসলি কৃষিজমিকে বহুফসলি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়, যা দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে ‘সবুজ বিপ্লব’-এর সূচনা করে এবং দেশকে প্রথমবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। 

জিয়াউর রহমান শিক্ষা দর্শনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে ঐতিহ্যবাহী ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয় সাধনের অংশ হিসেবে ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সমন্বিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সেইসঙ্গে তিনি ১৯৭৭ সালের ২৭ জানুয়ারি অধ্যাপক ড. এমএ বারীকে সভাপতি করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিকল্পনা কমিটি গঠন করেন। ১৯৭৭ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে মক্কায় অনুষ্ঠিত ওআইসি-র আন্তর্জাতিক ইসলামী শিক্ষা সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের এ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে মুসলিম বিশ্বের নীতিগত ও আর্থিক সমর্থন অর্জিত হয়, যার ফলে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। একইসঙ্গে, দেশের প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করতে তৎকালীন প্রকৌশল কলেজগুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানের পরিকল্পনা শুরু হয়। এ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালে দেশের প্রধান আঞ্চলিক প্রকৌশল কলেজগুলোকে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (বিআইটি) এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি পথ সুগম হয়।

যা হোক, বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত সময়ে জিয়াউর রহমান যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও জনকল্যাণমুখী। তিনি কেবল ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক ক্ষমতার চর্চা করেননি, বরং দেশের প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

স্পারসো প্রতিষ্ঠা, বিসিএসআইআরের স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি স্থাপন, বিটিটিবির মাধ্যমে টেলিযোগাযোগের আধুনিকীকরণ, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি গঠন কিংবা উলাশী প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ সেচ প্রযুক্তির গণমুখী প্রয়োগ- প্রতিটি পদক্ষেপই একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের দূরদর্শী পরিকল্পনাকে নির্দেশ করে। বর্তমান সময়ে দুর্যোগ মোকাবিলা, কৃষি উৎপাদন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সাফল্য দৃশ্যমান হচ্ছে, তার পেছনে এ প্রাথমিক প্রযুক্তিগত ভিত্তিগুলোর অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে। এসব যুগান্তকারী উদ্যোগ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে জিয়াউর রহমান আধুনিক বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার ইতিহাসে একজন স্মরণীয় পথপ্রদর্শক হিসেবে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন।

জিয়াউর রহমানের খালখনন কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হওয়া প্রযুক্তি ও স্থানীয় জনসম্পৃক্ততার সেই দূরদর্শী দর্শনই আজ একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বাংলাদেশকে একটি প্রজ্ঞা-অভিযোজিত সফটওয়্যার-ডিফাইন্ড স্টেটএবং কগনিটিভ ডেল্টা ফ্রেমওয়ার্ক (সিডিএফ) বিনির্মাণের পথ দেখাচ্ছে। তার সেই উৎপাদনমুখী ও কৃষিভিত্তিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আইওটি টেলিমেট্রির সাহায্যে স্মার্ট ফার্মিং এবং অঞ্চলভিত্তিক আঞ্চলিক ডেটা হাব গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উত্তরবঙ্গের শস্যভান্ডারের মস্তিষ্ক হিসেবে শস্যের জিনোম ডেটা বিশ্লেষণ এবং দক্ষিণাঞ্চলে ব্লু-ইকোনমি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো আজ নকশা করা হচ্ছে, তা মূলত জিয়াউর রহমানের মাটি ও মানুষকেন্দ্রিক স্বনির্ভরতা দর্শনেরই একটি আধুনিক ও অ্যালগরিদমিক রূপান্তর।  

বিদেশি প্রোপাইটারি সফটওয়্যার ও ক্লাউডের ওপর কৌশলগত নির্ভরশীলতা বা প্রযুক্তিগত উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তি পেতে আজ যে সার্বভৌম এআই, জাতীয় এলএলএম এবং নিজস্ব হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার সহ জাতীয় ক্লাউড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার কথা চিন্তা করা হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে দেশের মাটির বুকে নিজস্ব সক্ষমতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতা অর্জনের ইচ্ছার সেই ঐতিহাসিক ধারা।

একইভাবে, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তার সুসংহত কাঠামোগত সংস্কারের চিন্তাভাবনা আজ আধুনিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানের এআই-অগমেন্টেড গভর্নিং সিস্টেমে জেনারেটিভ এআইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যে স্বতঃপ্রণোদিত এজেন্টিক এআই ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কাজ করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে, তা সরকারি প্রশাসনকে একটি নিষ্ক্রিয় কাঠামো থেকে একটি সক্রিয়, চটপটে ও জনবান্ধব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার শক্তি রাখবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১-দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির আলোকে দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সরকারি কেনাকাটা, টেন্ডার ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় যে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিটি ডিজিটাল ট্রানজাকশনে জিরো-ট্রাস্ট সিকিউরিটি ডকট্রিন ও সাইবার কমান্ড প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে।  তা সরাসরি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতার আদর্শকে ধারণ করে। 

তৃণমূলের কর্মীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুসংগঠিত করা এবং সর্বস্তরে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বজনীন সেবা জনমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার যে আধুনিক রূপরেখা আজ আমরা বাস্তবায়নের চিন্তা করছি, তা প্রমাণ করবে যে শহীদ জিয়ার স্বনির্ভরতার আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মেলবন্ধনে বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে মেধাভিত্তিক উদ্ভাবক রাষ্ট্র হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার নতুন দিগন্তে পদার্পণ করবে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি   বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত রূপান্তর  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

সাহিত্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close