ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের পরপরই মাঠে নেমেছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। কিন্তু শুরু থেকেই নির্বাচনি মাঠে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি তৈরি করছে। একদিকে নির্বাচন কমিশন ‘ভালো মনোভাব’ দেখার কথা বলছে, অন্যদিকে প্রথম দিনেই বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, পারস্পরিক অভিযোগ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর সামনে এসেছে।
ভোটের প্রচারের প্রথম দিনেই কুমিল্লার হোমনায় সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হওয়া কিংবা বিভিন্ন এলাকায় হট্টগোলের ঘটনা দেখিয়ে দেয় নির্বাচনি সহনশীলতা এখনো কতটা ভঙ্গুর। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যেও প্রতিপক্ষকে ঘিরে তীব্র আক্রমণ, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ নির্বাচনি পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করছে।
গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বদলে যদি অভিযোগ আর অবিশ্বাসই প্রধান সুর হয়ে ওঠে, তবে তা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের জায়গা হলো, নির্বাচনি প্রচারের আড়ালে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য, বিশেষ করে এনআইডি ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ। নির্বাচন কমিশন একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে সতর্ক করেছে, যা অবশ্যই সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু সতর্কবার্তায় কি এ প্রবণতা বন্ধ হবে? ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তের সঙ্গে যুক্ত। এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে কমিশনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রধারী সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা কমিশনের দৃঢ়তার বার্তা দেয়।
একইসঙ্গে আচরণবিধি ভঙে জরিমানা, মামলা ও তদন্তের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা দেখায় কমিশন সক্রিয় রয়েছে। তবে কেবল সংখ্যা দিয়ে নয়, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা বিচার হবে মাঠপর্যায়ে তার দৃশ্যমান প্রয়োগে। বড় দল হোক বা ছোট দল, ক্ষমতাশালী প্রার্থী হোক বা স্বতন্ত্র সবার ক্ষেত্রে সমান আচরণ নিশ্চিত করাই কমিশনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। কমিশন বারবার ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি ও অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছে যাওয়ার কথা বলছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঠিক হলেও সাধারণ প্রার্থী ও নাগরিকদের কাছে এ প্রক্রিয়া কতটা সহজ, দ্রুত ও কার্যকর সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার না পেলে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর। নির্বাচনের মাঠে সহনশীল আচরণ, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং আচরণবিধির প্রতি সম্মান দেখানো তাদেরই প্রমাণ করতে হবে।
ভোট মানে কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি জনগণের আস্থার প্রশ্ন, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। প্রচারের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বলছে এ নির্বাচন সহজ হবে না। নির্বাচনি প্রচারণাকে ঘিরে বিএনপি, জামায়েতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই তীব্র হচ্ছে। এ কথার লড়াই কথাতে সীমাবদ্ধ থাকলেই উত্তম। তবে এ লড়াই নির্বাচন মাঠকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
সেদিক থেকে নির্বাচন কমিশনের কঠোরতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। এসব কিছুর সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হতে পারবে কি না।
কেকে/ এমএস