আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ‘১০-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের’ অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। ‘ওয়ান বক্স’ পলিসিতে ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু থেকেই আসন সমঝোতার আলোচনায় সক্রিয় ছিল চার দশকেরও বেশি পুরোনো এই দলটি। তবে জোটের চূড়ান্ত আসন বণ্টনে খেলাফত আন্দোলন একটি আসনও পায়নি, যা নিয়ে দলটির ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
যদিও আসন বণ্টনের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জানিয়েছিলেন, খেলাফত আন্দোলনের আসন পরে ঘোষণা করা হবে। ওই দিন জামায়াত-এনসিপিসহ জোট শরিকদের জন্য মোট ২৫৩টি আসনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাকি ৪৭টি আসন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণের কথা ছিল। যদিও পরবর্তীতে ইসলামী আন্দোলন আনুষ্ঠানিক জোট ত্যাগ করলে ফাঁকা ৪৭টি আসন জামায়াত ও অন্যান্য শরিক দল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। অভিযোগ উঠেছে, এখানেও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে খেলাফত আন্দোলন। এমনকি দলটির আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী নিজেও কোনো আসনের ছাড় পাননি।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জোট না ছাড়লেও শেষ মুহূর্তে এককভাবে ৮টি আসনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, জোটের শরিক হয়েও কোনো আসন না পাওয়ায় তারা কার্যত বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে এসব আসনে তাদের প্রার্থীদের শুধু বিরোধী জোট নয়, ‘৯ দলের’ প্রার্থীদের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
দলটির শীর্ষ এক নেতা জানান, ভবিষ্যতে উচ্চকক্ষে অন্তত দুটি আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। পাশাপাশি আরও কিছু রাজনৈতিক সমীকরণের কারণেই আপাতত ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য থেকে বের না হওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, জোটের শরিক হয়েও একটি দলকে সম্পূর্ণভাবে আসনবঞ্চিত রাখা ‘বেইনসাফি’। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, জামায়াত নিজে ২১৫টি আসন দখলে রেখে কোনো শরিক দলকে একটি আসনও না দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অবিচার। বিশেষ করে প্রথম দফায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার পর, ফাঁকা থাকা ৪৭টি আসনেও খেলাফত আন্দোলনকে জায়গা না দেওয়াকে তারা জামায়াতের ‘স্ট্যান্ডবাজি’ হিসেবে দেখছেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমাদের সারা দেশে ১৫০ প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। আমরাও সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সমঝোতা হবে এমন আলোচনা থাকায় আমাদের প্রার্থীরা সবগুলো আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি। কিন্তু শেষ সময়ে এসেও আমাদের কোনো আসন দেওয়া হয়নি। ফলে আমাদের মনে হয়েছেÑ এককভাবে নির্বাচন করা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে আমাদের কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিং হয়েছে, সেখানে সিদ্ধান্ত এসেছে আমরা ৮টি আসন নির্বাচন করব। তবে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় ‘জোট ত্যাগ’ করব না।’
উল্লেখ্য, ঢাকা-৭ আসনে খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, ঢাকা-১৬ আসনে মাওলানা তাওহিদুজ্জামান, শরীয়তপুর-২ আসনে মাওলানা মাহমুদুল হাসান, নেত্রকোনা-২ আসনে মাওলানা গাজী আবদুর রহিম, ফেনী-১ আসনে মাওলানা আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, ফেনী-২ আসনে আবুল হোসাইন ফারুক ও ফেনী-৩ আসনে অ্যাডভোকেট খালিদুজ্জামান খালেদ পাটোয়ারীকে প্রার্থী করেছে দলটি।
সূত্রের দাবি, গত শুক্রবার জামিয়া নূরিয়ায় যান জামায়াত প্রার্থী এনায়েত উল্লাহ। এ সময় তিনি খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তবে হাবিবুল্লাহ মিয়াজী সরে না দাঁড়ানোর ব্যাপারে নিজের অবস্থান জানান এবং এনায়েতুল্লাহকে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পরামর্শ দেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে খেলাফত আন্দোলন প্রার্থী করেছে আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সীকে। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ জেলার সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শাহজাহান শিবলী। এখানেও জামায়াত কাজ করছে তাদের দলীয় প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার জন্য। খেলাফত আন্দোলন এই আসনটি পেতে জামায়াতের সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গেলেও আসনটি তাদের ছাড়া হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার জামায়াত আমির তার নির্বাচনি প্রচার শুরুর অনুষ্ঠানে নিজ হাতে ঢাকা-১৬ (পল্লবী-রূপনগর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল আবদুল বাতেনের (অব.) হাতে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়েছেন। এই আসনে খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা তাওহিদুজ্জামান।
শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখিপুর) আসনে মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে খেলাফত আন্দোলন। কিন্তু এখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জোরদার প্রচার নিয়ে মাঠে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মাহমুদ হোসেন।
নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনে খেলাফত আন্দোলন মনোনয়ন দিয়েছে মাওলানা গাজী আবদুর রহিমকে। এই আসনে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে কাজ করেছেন জামায়াতের প্রার্থী সাবেক জেলা আমির এনামুল হক। তবে শেষ পর্যন্ত এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠানকে ১০ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হয়েছে। যদিও এনামুল হকের মনোনয়ন প্রত্যাহার না করতে জামায়াত সমর্থকরা আন্দোলনে করেছেন। এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা আবদুল কাইয়ুমের জনপ্রিয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে ফেনীর তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে খেলাফত আন্দোলন। দলটির তিন প্রার্থী হলেন ফেনী-১ আসনে আনোয়ার উল্লাহ ভূঁইয়া, ফেনী-২ আসনে মোহাম্মদ আবুল হোসেন ও ফেনী-৩ আসনে অ্যাডভোকেট খালিদুজ্জামান খালেদ পাটোয়ারী।
এর মধ্যে ফেনী-২ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া ছাড়াও রয়েছেন এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। জামায়াত প্রার্থী মঞ্জুকে সমর্থন দিয়ে প্রতীক বরাদ্দের আগেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তবে ফেনী-১ আসনে জামায়াতের এস এম কামাল উদ্দিন ও ফেনী-৩ আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন। ফলে ফেনীর তিনটি আসনেই খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থীদের ঘরে-বাইরে লড়াই করতে হবে।
কেকে/এমএফ