মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বিশ্ববাণিজ্যে বড় চ্যালেঞ্জ অশুল্ক বাধা
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:২৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাওয়ায় শুল্কের চেয়ে অশুল্ক বা নন-ট্যারিফ বাধাই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে শুল্কহার কমলেও বিভিন্ন দেশ টেকনিক্যাল কমপ্লায়েন্স, জটিল কাস্টমস প্রক্রিয়া ও রেগুলেটরি বিধিনিষেধের মাধ্যমে পণ্যের প্রবেশে অদৃশ্য বাধা তৈরি করছে, যা রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বাণিজ্য সহজীকরণে বড় অন্তরায় হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় কেবল রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং বাণিজ্যের খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন নীতি নির্ধারকরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার, কাস্টমস সংস্কার, বাণিজ্য সহজীকরণে ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য নীতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কাস্টমস পলিসি উইংয়ের সদস্য মুবিনুল কবির। এ সময় তিনি বলেন, অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) এবং প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং পদ্ধতিগুলো এখনো দেশে জনপ্রিয় হয়নি। ‘এইও’ সুবিধার শর্তগুলো শিথিল করার চিন্তা-ভাবনা চলছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘একসময় দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশ আসত কাস্টমস থেকে। এখন তা কমে ২২-২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বজুড়েই শুল্কহার কমছে, তবে এর জায়গা নিচ্ছে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। এখন এক দেশ আরেক দেশের পণ্য আটকাতে সরাসরি কর বাড়ায় না। বরং নানা ধরনের টেকনিক্যাল কমপ্লায়েন্স ও রেগুলেটরি বাধা তৈরি করে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- এসব নন-ট্যারিফ বাধা অতিক্রম করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা। তাই কাস্টমসকে এখন শুধু ট্যাক্স আদায়ের দিকে তাকালে চলবে না। ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের মাধ্যমে বাণিজ্যের খরচ কমিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।’

পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার প্রবণতার বিষয়ে সতর্ক করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘নিয়ম সহজ করতে গেলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সেই সুযোগের অপব্যবহার করেন। মিথ্যা ঘোষণা দিলে কাস্টমস বাধ্য হয় শতভাগ পণ্য পরীক্ষা করতে, এতে সময় নষ্ট হয় সৎ ব্যবসায়ীদেরও।’

তিনি বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণার ফলে শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয় না, বরং নিয়ম মেনে ব্যবসা করা উদ্যোক্তারাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। আপনারা যদি সঠিক ডিক্লেয়ারেশন দেন, আমরা দ্রুত পণ্য খালাসের নিশ্চয়তা দিতে পারব।’

বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি রফতানিমুখী শিল্পের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে এই সুবিধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’

তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই সুবিধা কি শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আরও বিস্তৃত করা যায়। একই সঙ্গে তিনি বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনেকে বন্ডেড পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি করেন- যা দেশীয় শিল্পের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে নিয়ম মেনে কর দিয়ে কাঁচামাল আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়েন।’

তিনি জানান, বন্ড অটোমেশন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হলে অপব্যবহার কমবে, সৎ ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ হবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ট্যারিফ ব্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা হলেও নন-ট্যারিফ বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যবসার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান। বিশেষ করে দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা সমালোচনা করেন। যাত্রীদের লাগেজ অতিমাত্রায় স্ক্যান করার প্রবণতা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে দেখা যায় না। এসব বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।’

বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘গতকাল (রোববার) ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে, তাদের কনসার্ন (উদ্বেগ) নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার নিয়ে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইমপোর্ট ট্যারিফ বা আমদানি শুল্ক বর্তমানে বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিদেশি অংশীদাররা এটি মেনে নেয়। কারণ, এটি বৈধ। কিন্তু নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার তারা মানতে পারেন না।’

বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘তারা বাংলাদেশের নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বিষয়ে বিশাল একটা ফর্দ আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে- যার মধ্যে ১৫টিই কাস্টমসের প্রক্রিয়া ও দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পর্কিত। তারা এখানে প্রক্রিয়ার সহজীকরণ চায়।’

তিনি বলেন, একসময় কাস্টমস সার্ভিসের সাফল্যের মূল মাপকাঠি ছিল কেবল রাজস্ব আহরণে। বর্তমানে এর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাণিজ্য সহজীকরণের ওপর। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে আমাদের প্রবেশাধিকার এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সাথে বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. জাইদি সাত্তার দ্রুত বাণিজ্যনীতি সংস্কারের তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে ট্রেড পলিসির (বাণিজ্য নীতি) যে সংস্কার হওয়া দরকার ছিল তা হয়নি। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে যদি না হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ আমদানি শুল্ক আদায় করে, যা জিডিপির ২.৫ শতাংশ। এটি কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা জরুরি।’

জাইদি সাত্তার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কেবল রাজস্ব আদায়ের দিকে নজর না দিয়ে ‘ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’ বা বাণিজ্য সহজীকরণে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাণিজ্যের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

অনুষ্ঠানে দেশের ৯টি প্রতিষ্ঠানকে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সনদ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগ। ফলে এসব কোম্পানি কাস্টমসের প্রক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, এশিয়া পেইন্টস (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বিআরবি ক্যাবলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ফুটস্টেপস বাংলাদেশ লিমিটেড, ওমেরা সিলিন্ডার লিমিটেড, জিহান ফুটওয়্যার, সুনিভার্স ফুটওয়্যার, কাটিং এজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও এমবিএম গার্মেন্টস লিমিটেড।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, এনবিআর সদস্য আল আমিন প্রামাণিক প্রমুখ।

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিশ্ববাণিজ্য   অশুল্ক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close