মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দুর্বল পররাষ্ট্রনীতিতে চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:০৬ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, রোহিঙ্গা সংকট ও পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং একটি ধারাবাহিক ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিত করতে সরকারের শক্তিশালী জনভিত্তি, রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য বলে মনে করছেন কূটনীতিক, রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা। 

তাদের মতে, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিভাজন বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বর্তমান মাল্টি-পোলার বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, দক্ষ দরকষাকষি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে একটি জনমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। 

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল মঙ্গলবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংলাপে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজর সভাপতি জিল্লুর রহমান।

জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন হলেও বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলাদা কোনো কমিশন হয়নি এবং এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এর স্থায়ী সমাধানে বা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারেও পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। 

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মাল্টি-পোলার কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে সব প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। এর সঙ্গে সরাসরি বিনিয়োগের বিষয়টি জড়িত। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য উপযুক্ত ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা একইসঙ্গে দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতেও সহায়ক হবে। 

তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক দরকষাকষি বা নেগোসিয়েশনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। পাকিস্তান চীন থেকে অস্ত্র ক্রয় করলেও যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি, যা তাদের দক্ষ কূটনীতিরই ফল। সরকার যদি জনভিত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে যে কোনো সরকারই কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে শক্ত ও কার্যকর অবস্থান নিতে সক্ষম হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আমেনা মহসিন বলেন, রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভিসাসংক্রান্ত জটিলতাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে কূটনীতির গুরুত্ব বেড়েছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন দিক থেকে ভারতের সীমান্তঘেরা অবস্থান, অভিন্ন নদী ও পরিবেশগত নির্ভরতা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। 

তিনি সীমান্ত বিরোধ, অবৈধ বাণিজ্য ও অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন। 

পাশাপাশি তিনি বলেন, ভারতের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের কারণে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের রপ্তানির সিংহভাগ এসব বাজারনির্ভর।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহসিন আলী খান বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের অন্য অংশের কাজ। সহযোগী হিসেবে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারে, তবে এ দায়িত্ব অন্যদের। কাজেই, এ মন্ত্রনালয়কে অর্থ পাচারের জন্য দায়ী করা ঠিক নয়।

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। ইশতেহারের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনগণ ও দেশের স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান বলেন, শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই জনগণের মধ্যে দৃঢ় জনভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, যে দেশের জনগণ বা জনভিত্তি দুর্বল, সেই দেশের ওপর অন্য রাষ্ট্র সহজেই নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, বাংলাদেশের জন্য তিনটি দিক পররাষ্ট্র নীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা হল বি আর আই, এল ডি সি, ইন্দো-প্যাসিফিক। আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি ঠিক না থাকলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে পররাষ্ট্র নীতি থাকবে না। আমাদের পাওয়ার অভার মরালিটি কাজ করে।

সাবেক সংসদ সদস্য ও জনতা পার্টি বাংলাদেশ-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মিলন বলেন, দেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি জাতীয় নীতি হওয়া উচিত যা সরকারের পরিবর্তনেও অপরিবর্তিত থাকে। এর জন্য একটি জাতীয় পররাষ্ট্রনীতির দলিল প্রণয়ন জরুরি। এ ছাড়া তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতা ও গোপন চুক্তি করার অভিযোগ তুলে নিন্দা জানান।

সংলাপে অংশ নিয়ে অন্য বক্তারা বলেন, ডিসেম্বর মাসে পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও তথ্যভিত্তিক সমাধান জরুরি। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা উল্লেখ করে তারা বলেন, এর স্থায়ী সমাধানে ধারাবাহিক ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। 

বক্তারা অভিযোগ করেন, পররাষ্ট্রনীতিতে উন্নয়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি; বরং অতিমাত্রায় বিদেশ সফর ফলহীন ছিল। তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে এবং মূল সমস্যা ও অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। পানি কূটনীতি ও আন্তঃসীমান্ত নদী ইস্যু গুরুত্ব পেলেও যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নীতিনির্ধারণ সীমিত হয়ে পড়েছে। 

কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির জন্য জাতীয় ঐকমত্য, জনগণের সমর্থন এবং সরকার-জনগণের সুসম্পর্ক অপরিহার্য বলেও তারা মত দেন।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি   চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close