বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে টেকনাফ স্থলবন্দর বন্ধ রয়েছে প্রায় ১০ মাস হতে চলেছে। স্থলবন্দর বন্ধ থাকার কারণে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ব্যাপক হারে বেড়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। যদি স্থলবন্দর চালু থাকত তবে চোরাচালান অনেকাংশে কমে যেত। স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করতে পারতেন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে সরকার পেত রাজস্ব। এখন তার উল্টো হচ্ছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা জটিলতার কারণে সৃষ্ট এ অচলাবস্থায় সরকার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। যেখানে প্রতি মাসে বন্দরের লোকসান হচ্ছে ৪০ লাখ টাকা। কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরে টানা ১০ মাস আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চলমান এ ক্ষতি মোকাবিলায় দ্রুত সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বন্দরের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিক এখন বাধ্য হয়ে চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা সীমান্ত এলাকায় নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ২৩৬ কোটি টাকা কমে হয়েছে ৪০৪ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র ১০ মাসে ৩০০ কোটি টাকা কমে হয়েছে প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
সরেজমিন গতকাল দেখা যায়, পুরো বন্দর ফাঁকা পড়ে আছে। মাঠে কোনো পণ্য মজুত নেই। নাফ নদের জেটিতে পণ্যবোঝাই ট্রলার-জাহাজও নেই। বেকার হয়ে গেলেন বন্দরের কাজে যুক্ত শ্রমিকরা।
সরেজমিন কথা হয় শ্রমিক আবদুল নবীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বন্দরের মালামাল খালাস করে দিনে ৭০০ টাকা আয় হতো। তা দিয়ে চলত সংসার। দুই মাস ধরে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ। তাই এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বন্দরে শ্রমিকের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক বেকার জীবন কাটাচ্ছেন।
কাস্টমস কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, নানা রকম জটিলতার কারণে গত এপ্রিল মাস থেকে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্দর সচল করতে দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক চলমান রয়েছে। আমরা আশা করছি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজস্ব আয় বাড়বে আমাদের।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য বলছে, মিয়ানমার থেকে সর্বশেষ এপ্রিল মাসে চাল, ডাল, ভুট্টা, শিম, আদা, রসুন, সয়াবিন তেল, পাম ওয়েল, পেঁয়াজ, মাছ আমদানি করা হয়। এরপর থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে বন্দরের ওপরে নির্ভরশীল কয়েক লাখ শ্রমিক অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চোরাচালানের মতো অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। বাজারে চোরাইপণ্য বাড়ছে, আর সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।
জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রায়হান কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার চাইতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যারা রয়েছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। আশা করছি, আপনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিস্তারিত পেয়ে যাবেন।’
কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিংয়ের (সিএন্ডএফ) সভাপতি এহতেশামুল হক বাহদুর বলেন, ‘গত এক বছর ধরে ব্যবসা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হওয়ার পথে এবং আয় না থাকলেও তাদের ব্যাংকের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বলতে পারেন, অনেক ব্যবসায়ী একেবারে পথে বসেছে।’
তার তথ্যমতে, প্রায় ৯০ লাখ মার্কিন ডলার মিয়ানমারে পড়ে আছে। কীভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নিব তাও জানি না।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, মিয়ানমারে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন করে আরাকানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারলে ব্যবসা চালু হবে। এর আগে আশা দেখছি না।’
টেকনাফ স্থলবন্দর শ্রমিক সর্দার আবুল হাশিম বলেন, ‘গত ৯ মাস ধরে স্থলবন্দর বন্ধ রয়েছে। এর ফলে আমরা কর্মহীন হয়ে অনেক কষ্টে আছি, শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্ধ থাকা আমদানি-রপ্তানি কখন খুলবে সেই আশায় আছি।’
টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল থেকে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতি মাসে বন্দরের ব্যয় বাবদ খরচ হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। অথচ আয় শূন্য। এই ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের। নিরাপত্তার শঙ্কা দূর না হলে সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না।’
চোলাচালান বৃদ্ধির পাওয়ার প্রসঙ্গে কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্ত চোরাচালানকে নিরুৎসাহিত করতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়েছিল। দুই বছর আগেও বাণিজ্য জমজমাট ছিল। চোরাচালান ছিল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। এখন স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় সুবিধা নিচ্ছেন দুই দেশের চোরাচালানিরা।’
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলার অন্তত ৩৩টি পয়েন্ট দিয়ে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি, আলু, পেঁয়াজ, রাসায়নিক সার, সিমেন্ট, রড, ওষধ, প্লাস্টিক পণ্য মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা, আইসের বড় বড় চালান। সঙ্গে আনা হচ্ছে হাজার হাজার গরু-মহিষ। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে গরুসহ মাদকের চোরাচালান বেড়েছে কয়েক গুণ।
বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে মিয়ানমার থেকে পাচারের সময় ৪৫টির বেশি অভিযানে ১২ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট, ইউরিয়া সার, খাদ্যপণ্যসহ অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে টেকনাফ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে ছয়টি সুপারিশ পেশ করেছে- ১. আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা। ২. সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান প্রতিরোধ ও শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে যৌথ কমিটি গঠন করে টাস্কফোর্সের কার্যক্রম গতিশীল করা। ৩. স্থানীয় চেম্বার, আমদানি-রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে মতবিনিময় ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য নীতিগত সহায়তা প্রদান। ৪. বর্ডার ট্রেড চুক্তির আলোকে জনপ্রিয় ও লাভজনক পণ্য অন্তর্ভুক্ত করে নতুন তালিকা প্রণয়ন। ৫. পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত পরিসরে বন্দর চালু করা। ৬. মিডিয়া ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু রাখা।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে স্থলবন্দর চালু করা যেতে পারে। এখানে যেহেতু দুটি দেশের বিষয় তাই একক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। বাংলাদেশে স্থানীয় যারা আছেন, জেলা প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে কি সমস্যা রয়েছে তা সমাধান করতে হবে। মোট কথা, এটি স্থানীয়ভাবে সমাধান করতে হবে।’
কেকে/এমএ