বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনি প্রচারণায় দীর্ঘদিনের পরিচিত দৃশ্য ছিল দেয়াল, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা বাজারজুড়ে পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া পরিবেশ। পোস্টার দেখেই সাধারণ ভোটার বুঝে নিতেন নির্বাচন আসন্ন। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই চিরচেনা দৃশ্যের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়া শুরু হয়েছে দেশ জুড়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকেই প্রার্থীরা প্রচারে নামার অনুমতি পেলেও, ফুলবাড়িয়ার আশপাশের এলাকাগুলো ঘুরে কোথাও চোখে পড়েনি পরিচিত কোনো নির্বাচনি রঙ, স্লোগান কিংবা প্রার্থীদের মুখচ্ছবি। ময়মনসিংহ-৬ ফুলবাড়িয়া আসনে চিরচেনা নির্বাচনী জৌলুস ও উৎসবমুখর পরিবেশ অনেকটাই অনুপস্থিত।
প্রচারণার ৭ম দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। সরকারের নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে পোস্টার, বিলবোর্ড ও দেয়াললিখন। পাশাপাশি মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও আকাশপথে প্রচারণার উপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এ আসনে মোট পাচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অধিকাংশ প্রার্থীর পক্ষেই ব্যানার বা ফেস্টুন চোখে পড়েনি। তবে বড় দুই দলের প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আখতারুল আলম ফারুক (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অধ্যক্ষ মোহা. কামরুল হাসান মিলন (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র অধ্যাপক মোঃ জসিম উদ্দিন (প্রতীক ঘোড়া), এর পক্ষে ভোট চেয়ে কিছু ব্যানার দেখা গেছে।
এর মধ্যে জামায়াত প্রার্থীর ব্যানারের সংখ্যাই বেশি। বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুতের খুঁটিতে সাদা-কালো এসব ব্যানার বাঁধা ছিল। এই দুই দল ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কয়েকটি নির্বাচনী ক্যাম্প দেখা গেলেও অন্য অন্য প্রার্থীর কোনো ক্যাম্পের দেখা পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র আখতার সুলতানা (প্রতীক ফুটবল) কয়েকটি ব্যানার চোখে পড়েছে। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকিং করার সুযোগ থাকলেও বিএনপি, জামায়াত ও এক স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অন্য কারও প্রচারণার মাইক এলাকাবাসী শোনেনি।
তিনি রিপন মিয়া বলেন, আগে নির্বাচন মানেই রাস্তা জুড়ে পোস্টার, ব্যানার, মিছিল। এখন কিছুই নেই। কে দাঁড়িয়েছে, কোন দলে কিছুই বুঝি না। মনে হচ্ছে নির্বাচন হচ্ছে নীরবে। তার ভাষায়, আমি জানিই না আমাদের এলাকায় কে প্রার্থী।
পোস্টার না থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে খবর পৌঁছাবে কীভাবে?এক চা দোকানে বসে কয়েকজন প্রবীণ ভোটার জানান, তাদের অনেকেরই স্মার্টফোন নেই, ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যাসও নেই। ৬৬ বছর বয়সী বরকত আলী বলেন,আমরা অনলাইনে প্রচারণা দেখব কীভাবে? পোস্টারই ছিল সবচেয়ে সহজ উপায়। এখন তো নির্বাচন হচ্ছে, সেটাই ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে সারাদেশে শত শত প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো ছাপ নেই। নেই প্রচারণার উত্তাপ, নেই ভোটের উৎসবমুখর পরিবেশ। রিকশাচালক মোশারফ বলেন, পোস্টার ছাড়া আমরা চিনব কীভাবে কার মার্কা কী, কার চেহারা কী? ভোট তো চেহারা আর প্রতীক দেখেই দেই। এখন মনে হচ্ছে নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু মানুষের জন্য নয়।
অন্যদিকে ভিন্ন মত দিয়ে জাহিদ হাসান বলেন, ‘পোস্টার না থাকায় শুরুতে প্রার্থী চিনতে সমস্যা হচ্ছে ঠিকই, তবে পরিবেশ রক্ষা ও নির্বাচনের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই পরিবর্তনকে আমরা স্বাগত জানাই। পরিবেশবান্ধব ও সুশৃঙ্খল নির্বাচনের এই নতুন সংস্কৃতি ভোটারদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কতটা সাড়া ফেলতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, এবার কাগজের পোস্টারের পরিবর্তে সীমিত আকারে পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন প্রার্থীরা। এ ছাড়া একটি সংসদীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি নির্দিষ্ট মাপের (১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯ ফুট প্রস্থ) বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও এর দৃশ্যমান ব্যবহার তেমন দেখা যায়নি।
কেক/এমএফ