জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বইছে ভোটের আমেজ। ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। তবে ভোটের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার খবর মিলছে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। যা নির্বাচনের পরিবেশকে ক্রমইে ঘোলাটে করে তুলছে।
প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যমতে, নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষে জড়াচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা। আবার কোথাও বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাঝেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এর বাইরেও জামায়াত কর্মীদের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের সমর্থকদের ওপর হামলা ও দলটির অফিসে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল ভোলা-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থীর নারী কর্মীদের ওপর হামলা করে একই আসনের জামায়াত প্রার্থীর কর্মীরা। এতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী কামাল উদ্দিনের তিন কর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৯টায় চরফ্যাশন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালে এ হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা আহত তিনজনকে উদ্ধার করে চরফ্যাশন হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। এই ঘটনায় ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার বরাবর একটি অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোলা-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত হাত পাখা প্রতীকের প্রার্থী কামাল উদ্দিনের মেয়ে মারিয়া কামাল ও তার দুই ভাইসহ কয়েকজন নারী কর্মীদের নিয়ে পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সকাল ৯টার দিকে তার বাবার পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা চালান। এ সময় জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী মোস্তফা কামালের কর্মী সোহেল ও আলাউদ্দিন তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে সোহেল ও আলাউদ্দিন দলবদ্ধ হয়ে হাত পাখার কর্মীদের ওপর হামলা চালায়।
ঘটনার পরপরই জামায়াত কর্মী আলাউদ্দিন ও সোহেল মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তবে চরফ্যাশন উপজেলা জামায়াত ইসলামীর আমির অধ্যক্ষ মীর মো. শরিফ জানান, যদি আমাদের কর্মী এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন জানান, ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমাকে ঘটনাটি অবগত করেছে। তবে তারা নিজেরাই সমঝোতা করবে বলেও জানিয়েছে।
এদিকে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ধর্মীয় বয়ানের নামে জামায়াতের পক্ষে চাওয়া হচ্ছে ভোট। জামায়াতকে ভোট দিলে নাকি মিলবে বেহেস্তের টিকিট। এ ধরনের বয়ান নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা যাচ্ছেন ঘরে ঘরে। ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। যা নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
তাদের ভাষ্য জামায়াত সবসময় অপরাজনীতি করে আসছে। কখনো ধর্মের লেবাসে, কখনো বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়। এ জন্য তারা এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে উসকে দিয়ে ফাঁদ পাতে। তাদের উসকানিতে যদি প্রতিপক্ষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন সেটাকে নিয়ে রাজনীতি করে তারা। তাদের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনি বিধি ভঙ্গ করে মানুষের কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছে- এর প্রতিবাদ করলেই অমনি অনলাইনে তাদের শত শত পেজ থেকে একযোগে অপপ্রচার চালানো হয়।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় একটি রাজনৈতিক দল ‘ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করছে’। গতকাল বুধবার বিকালে গুলশানে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।
মাহাদী আমীন বলেন, ‘২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত যে দলটি নিজেই সরকারের অংশ ছিল। এখানে তাদের দুটো মন্ত্রী ও বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ছিল। সরকারে থাকা অবস্থায় তখন দুর্নীতির বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে তারা নির্বাচনি মাঠে এসে ফ্যাসিবাদী প্রোপাগান্ডার সেই ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছে। আমরা এই ভূমিকাকে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছি।’
তিনি বলেন, ‘উপরন্তু এটি আজ স্পষ্ট যে, ভোট চাইতে গিয়ে সেই নির্দিষ্ট দলটি ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার, জান্নাতের প্রলোভন, কোরআন শরিফে শপথ করানো, এমনকি বিকাশ নম্বরে টাকা দেওয়ার বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে যারা নিজেরাই টাকা দিয়ে ভোটারদের ভোট কেনার চেষ্টা করছে আবার তারাই যখন দুর্নীতির গল্প শোনাচ্ছে সেটি তাদের তথাকথিত সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’ এ সময় নির্বাচন আচরণ বিধি মেনে চলার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মাহদী আমীন।
মাহদী আমীন বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, একটি নির্বাচনি জনসভায় সেই রাজনৈতিক দলটির আমির বগুড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপন এবং বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। বাস্তবতা হলো এই দুটি বিষয়ই ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুমোদিত এবং এ লক্ষে প্রশাসনিক কার্যক্রম বহমান রয়েছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগও সম্পন্ন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘অতএব বিদ্যমান একটি সরকারি সিদ্ধান্তকে নতুন করে দলীয় প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করে বগুড়াবাসীকে বিভ্রান্ত করার যে অপচেষ্টা কেন সেটা প্রশ্ন জাগাচেছ।’
মাহদী আমীন বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে, নওগাঁ সাপাহাড় উপজেলার একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন আল আমিন চৌধুরীকে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কারণে একটি নির্দিষ্ট দলের নেতাকর্মীদের চাপে সেই চাকরি থেকে অব্যাহিত প্রদান করা হয়েছে। এটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের একটি বাজে দৃষ্টান্ত। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং প্রত্যেককে যার যার পেশা, যার যার ধর্ম বা স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন্ন থাকে তা নিশ্চিতের জন্য অবিলম্বে তাকে পুনঃবহালের দাবি জানাচ্ছি।’
এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সিলেটে একজন প্রার্থীর বক্তব্য শোনা যাচ্ছে সেই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি করেন যে নির্বাচিত হলে তাকে জিজ্ঞাসা না করে কারও বাড়িতে যেতে পারবে না পুলিশ। এটি নিঃসন্দেহে অসাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি। একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী যদি এ ধরনের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পান তাহলে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। আমরা বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে কাউকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
‘কিন্তু তাই বলে গ্রেফতার করতে হলে কোনো একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর বা সংসদ সদস্যের অনুমতি লাগবে এ ধরনের বক্তব্য সেই ফ্যাসিবাদী মনোভাবেরই শামিল। আমরা এ বিষয়ে যথা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আহ্বান জানাচ্ছি।’
কেকে/এলএ