মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নির্বাচন ঘিরে ‘বাড়তি উদ্বেগ’
শঙ্কা জাগাচ্ছে লুটের অস্ত্র
খোলা কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫১ এএম আপডেট: ০৭.০২.২০২৬ ১০:২৫ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল, দেড় বছরেও সেগুলো পুরোপুরিভাবে উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের এখনও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

নির্বাচনের আগে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আসন্ন সংসদ নির্বাচন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ভাষ্যও একই- নির্বাচনের আগে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরেও পুরোপুরিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ বাহিনী। এ অবস্থায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যেই নির্বাচনের আগে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটছে, যা ভোটারদেরকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে কীভাবে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, সরকারের উচিত সেটা ভোটারদের সামনে তুলে ধরা। কারণ নিরাপত্তা ইস্যুতে আশ্বস্ত করা না গেলে তাদের ভোটকেন্দ্রে আনা কঠিন হয়ে উঠবে।’

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্রপাতি উদ্ধার না হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে গত ১৭ মাসে দফায় দফায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে সেনা-পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। এমনকি লুণ্ঠিত অস্ত্রের সন্ধান পেতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারও ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এতসব তোড়জোড়ের পরও অস্ত্র উদ্ধারে আশানুরূপ সফলতা পাওয়া যায়নি। হাতবদল হয়ে অনেক অস্ত্র অপরাধীদের কাছে চলে গেছে বলেও জানা যাচ্ছে।

“লুট হওয়া অস্ত্রগুলো গত দেড় বছরে পুরোপুরি উদ্ধার হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটের আগে অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন হতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।

অন্যদিকে থানা থেকে পুলিশের যেসব অস্ত্র ও গুলি লুট হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক অস্ত্র ও গুলি গত দেড় বছরে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, এমনকি মানুষ হত্যার মতো অপরাধ কাজেও ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গত বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে খুলনা থেকে আটক দুই ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশের ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, একটি শটগান এবং বেশকিছু গুলি উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, আটক ব্যক্তিরা লুটের ওইসব অস্ত্র ও গুলি চাঁদাবাজিসহ নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছিল। এ ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে চট্টগ্রামে থেকেও লুটের বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। সেগুলোরও ছিনতাই ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে জানানো হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় শাহিদা আক্তার নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি এলাকার এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে মরদেহ উদ্ধার কর পুলিশ।

তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট করা পিস্তল দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। পরে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে সেই পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলছেন, ‘লুটের যেসব অস্ত্র সাধারণ অপরাধীদের হাতে পড়েছে, তারাই ছিনতাই-ডাকাতির মতো ঘটনায় সেগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক অস্ত্র হাত বদল হয়ে উগ্র গোষ্ঠীগুলোর কাছেও চলে যেতে পারে। সেটি ঘটে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’

একই কথা বলছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘খোয়া যাওয়া অস্ত্র সব সময়ই নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকে। কারণে সেগুলো কাদের হাতে পড়েছে এবং তারা কী উদ্দেশ্যে সেটার ব্যবহার করতে চাচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব না।’

নির্বাচন ঘিরে ‘বাড়তি উদ্বেগ’: অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলানায় এবারের সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। “এই বাড়তি উদ্বেগের একটা বড় কারণ হলো পুলিশ বাহিনীর দুর্বল অবস্থান। সাধারণ মানুষ এখনও তাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না,” বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম। 

জুলাই গণ অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের সদস্যরা অনেক জায়গায় হামলা ও হত্যার শিকার হন। এ অবস্থায় একদিকে বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সেইসঙ্গে পুলিশের সদস্যরাও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর পুলিশকে মাঠে ফেরানো গেলেও গত দেড় বছরে বাহিনীটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। 
“পুলিশের এই দুর্বল অবস্থানের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, কিন্তু পুলিশের সদস্যরা সেখানে কতটা শক্ত ভূমিকা পালন করতে পারবেন, সেটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ঠ অবকাশ রয়েছে,” বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবার ৫১টি দল ভোটে অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। “একটা বড় দল হওয়ার পরও নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ফলে তারা নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা করতে পারেন। এটা এবারের নির্বাচনের আরেকটা বড় ঝুঁকি করতে পারে,” বলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ‘নতুন মাত্রা’: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার মধ্যে লুটের সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। “সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানোর পরও লুটের অস্ত্র ও গুলির বড় একটা অংশ জমা পড়েনি। কাজেই এটা পরিষ্কার যে, যাদের কাছে অস্ত্রগুলো রয়েছে, তারা সেগুলো ভালো কোনো উদ্দেশ্যে রাখেনি,” বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

“সুযোগ পেলেই তারা অস্ত্রগুলোকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের মৌসুমকে তারা সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে,” যোগ করেন মি. ইসলাম। ইতোমধ্যেই একাধিক প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্যপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে।

“প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপরেও হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনগণকে নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে,” বলছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রার্থীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহু প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র রাখার লাইসেন্স।

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  শঙ্কা   লুটের অস্ত্র   নির্বাচন   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close