আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি নেই। তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে ভোট। তাই শেষ মুহূর্তে জোরেশোরে চলছে নির্বাচনি প্রচারণা ও গণসংযোগ। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে অস্থিরতা ও সহিংসতা ছড়ানোর চক্রান্তও চলছে।
এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে বড় দুই দল বাংলাদেশ জাতীয়তবাদী দল-বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। তবে বড় দুই দলের নির্বাচনি সংঘর্ষের ফায়দা নিচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ- এমন তথ্য রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে।
তথ্য সূত্র বলছে, জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে ঢুকে সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বিশৃঙ্খলার পাঁয়তারা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আসন্ন নির্বাচন বানচাল এবং দেশে ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির পলাতক নেতাকর্মীরা।
একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশকে অস্থিতিশীল করতে দীর্ঘদিন ধরেই পাঁয়তারা চালাচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগ। নির্বাচনকে সামনে রেখে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তারা কখনো প্রকাশ্যে, আবার কখনো নেপথ্যে থেকে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে।
সূত্র বলছে, এরই মধ্যে নানা কৌশলে ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। তারা দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অরাজক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। জামায়াতের সমাবেশে ভিরে যাচ্ছে। সারা দেশের তৃণমূলে এভাবে কৌশল সাজাচ্ছে আওয়ামী নেতাকর্মীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের বিভিন্ন সমাবেশ ও নির্বাচনি প্রচারণায় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীকে অংশ নিতে দেখা গেছে। কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনি সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার।
গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনে উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। তিনি কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাকে অপসারণ করা হয়।
এ ছাড়া গত ১৩ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী ও আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের নির্বাচনি বৈঠকে বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। ওইদিন বিকালে দিরাই উপজেলার বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও পেজে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, রাজানগর ইউনিয়নের চকবাজার এলাকায় আয়োজিত বৈঠকে মাইকে বক্তব্য দিচ্ছেন গোলাপ মিয়া নামে এক আওয়ামী লীগ নেতা। এ সময় জামায়াতের এমপি প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনিরকে তার বাম পাশে বসে থাকতে দেখা যায়।
এদিকে নির্বাচন বানচালের কৌশল হিসেবে নাটোরের বড়াইগ্রামে জাতীয় নির্বাচনকে অবৈধ দাবি ও গণভোটকে ‘না’ বলার আহ্বান সংবলিত পোস্টার সাঁটিয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ। গত সোমবার এসব পোস্টার সাঁটানোর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, রোববার বিকালে উপজেলার বনপাড়া পৌর বিপণিবিতানের দেয়ালে সাঁটানো জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে ‘না’ বলুন সংবলিত এসব পোস্টার স্থানীয়দের চোখে পড়ে। সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারীর ছবি সংবলিত এসব পোস্টারে ‘গণভোটকে না বলুন’ ‘অবৈধ নির্বাচন মানি না, মানবো না’, ‘সারা বাংলা বেঁধেছে জোট, নৌকা ছাড়া কিসের ভোট’সহ বিভিন্ন সেøাগান লেখা রয়েছে। পোস্টারের নিচে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বড়াইগ্রাম উপজেলা শাখা লেখা রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করতে একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও রাজনৈতিক ঐক্যের কারণে সেসব পরিকল্পনা সফল হয়নি। ফলে এখন দলটির পলাতক নেতারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের নির্বাচনি সভা-সমাবেশ আওয়ামী লীগের জন্য শাপে বর হয়েছে। তারা এখন জামায়াত কর্মীর ছদ্মবেশে জড়ো হবে। ফলে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের চিহ্নিত করাটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশ একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের সচেতন হতে হবে, কোন প্রার্থী কোন আদর্শের প্রতিনিধি এবং কাদের হয়ে তিনি নেপথ্যে কাজ করছেন। নাম পাল্টে বা দলের লেবাস বদল করে বিপ্লবের চেতনাকে নস্যাৎ করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা রুখে দিতে হবে।’
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম বাধা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্কোন্দল। এ ছাড়া নির্বাচনকালে সীমান্ত দিয়ে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের ঢুকে পড়ার যে আশঙ্কা আছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কোনো জোরালো অভিযান দেখছি না।
তবে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।’
তারা বলছে, ‘নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চলছে।’
গতকাল বরিশালের গৌরনদীতে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে আটক করেছে সেনা সদস্যরা। আটকরা হলেন মহিলারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সৈকত গুহ পিকলু এবং তার ছোট ভাই সলিল গুহ পিন্টু। নির্বাচন বানচালে নাশকতা ও সহিংসতার পরিকল্পনা হিসেবে অস্ত্র ও বোমা সংগ্রহ করা হচ্ছিল বলে জানান গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাশেদ।
তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের অস্ত্র, বোমা ও মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে যে কোনো ধরনের নাশকতা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিনে সংঘটিত যে কোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হবে বলে।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘নির্বাচনে কোনো প্রকার সহিংসতা হলে তার দায়ভার ভোটে না থাকা দলগুলোকেই নিতে হবে।’ তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে কোনো ধরনের গণ্ডগোল বা বিশৃঙ্খলা হচ্ছে না। যারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, মূলত তারাই দেশে গণ্ডগোলের কথা বলছে।’
গতকাল বুধবার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে যথেষ্ট সংযত আচরণ করছে। তবে নির্বাচনে কোনো প্রকার সহিংসতা হলে তার দায়ভার ভোটে না থাকা দলগুলোকেই নিতে হবে।’
কেকে/এলএ