ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। ধুলো আর ভিড়ের ক্লান্তি উপেক্ষা করে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। কারও কোলে শিশু, কারও হাতে বৃদ্ধ মায়ের হাত—আবার কেউ বা বাবার ঘাড়ে। সবার চোখে একটাই প্রত্যাশা—এক নজর তারেক রহমান।
দীর্ঘ ১৯ বছর অপেক্ষার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে বগুড়ার শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে নির্বাচনি জনসভায় উপস্থিত হন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দুপুরের পর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ জনসভা স্থলে জড়ো হতে থাকে। সময় গড়ালেও মাঠ ছাড়েনি জনতা। অপেক্ষা যেন এখানে ক্লান্তি নয়, বরং এক ধরনের আবেগে পরিণত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় মানুষে ভিড়ে অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাঠে থাকা মেডিকেল টিম তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেন অসুস্থদের। এর মধ্যে চারজনকে ভর্তি করা হয় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে।
ছবি : তারেক রহমানের ফেসবুক থেকে নেওয়া
জনসভাস্থলে অনেক নারীকে দেখা গেছে চোখে পানি নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। কেউ বলছিলেন, “জানি না কখন আসবেন, তবু না দেখে যাব না।” বৃদ্ধদের কেউ লাঠি ভর দিয়ে, কেউ নাতির হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘ সময়। শিশুদের মাঝেও ছিল উৎসুক দৃষ্টি। চারপাশের স্লোগান আর উত্তেজনায় তারা যেন বুঝে নিয়েছে, আজকের দিনটা আলাদা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাত ১২ টা ২২ মিনিটে যখন তারেক রহমানের বক্তব্য শুরু করেন—মুহূর্তেই জনসভাস্থল রূপ নেয় আবেগের সাগরে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অনেককে দেখা যায় মোবাইল ফোন উঁচিয়ে ধরে সেই মুহূর্ত ধরে রাখার চেষ্টা করতে, কেউ আবার চোখ ভেজা অবস্থায় নীরবে তাকিয়ে থাকেন মঞ্চের দিকে।
১৪ মিনিটের বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, “১৯ বছর পরে নিজ ভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি। নিজের ঘরে এসে কি বলব—তাল হারিয়ে গেছি। ঘরের মানুষের কাছে কি বলব বুঝে উঠতে পারছি না। ১৯ বছর আগে যারা আমাকে দেখেছেন তাদের মনে থাকার কথা আমরা সেই সময় মানুষের প্রয়জনীয় কাজগুলো করেছি। বনানী-মাটিডালী সড়ক প্রশস্ত, গ্যাস লাইন, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল আমরা করেছি। বগুড়া জেলা ছিল আমার কাছে মডেল জেলা। আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বগুড়া জেলায় অনেক কাজ করতে পেরেছি।”
ছবি : তারেক রহমানের ফেসবুক থেকে নেওয়া
তিনি বলেন, “বগুড়া শহরে সব কিছুই আছে। যার কারণে কিছু কাজ ছাড়া বগুড়ার মানুষকে ঢাকা যেতে হয় না। সামনে নির্বাচন, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নির্বাচন ব্যাপারে আমাদেরকে সিরিয়াস থাকতে হবে। কারণ, এই নির্বাচন আমাদেরকে দিক নির্দেশনা দিবে—আগামীতে দেশ কোন পথে যাবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে ১২ তারিখের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।”
তারেক রহমান আরও বলেন, “বগুড়ার সন্তান হিসেবে আপনাদেরকে বলি, আপনারা সুযোগ দেন সরকার গঠন হলে আপনাদের সব দাবি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করব। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শুধু বগুড়ার জন্য কাজ করেছি এখন সারাদেশের জন্য করতে হবে। গত ১৫ বছর শুধু বগুড়া না, সারাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। মানুষ চিকিৎসা পায়নি, কৃষক তার পণ্যের মুল্য পায়নি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। ১৫ বছরে মেগা প্রজেক্ট যেমন হয়েছে তেমনি মেগা দুর্নীতি হয়েছে। দুর্নীতি নিযন্ত্রণ করতে হবে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বগুড়ার সাথে সমগ্র দেশের কথা চিন্তা করতে হবে। সব কিছু যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ আমার কিছু দেয়ার নাই। আপনাদের কাছে চাইতে এসেছি। বগুড়ার মানুষ পাশে থাকলে আমরা বাংলাদেশকে সুন্দর ও শক্তিশালী করতে পারব। আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। করব কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”
ছবি : তারেক রহমানের ফেসবুক থেকে নেওয়া
বক্তব্য শেষে তিনি নিজেসহ সাতটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করে দেন। তারেক রহমানের কণ্ঠে ছিল প্রত্যয়ের বার্তা, আর মাঠজুড়ে থাকা মানুষের চোখে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা আশা।
জনসভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এত কষ্ট করে এসেছি, শুধু একবার তাকে দেখার জন্য। আজ মনে হলো অপেক্ষা সার্থক। কারও কণ্ঠে ছিল স্বস্তি, কারও চোখে আবার ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
বগুড়ার এই জনসভা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়—এটি ছিল অপেক্ষা, বিশ্বাস আর আবেগের মিলনমেলা। যেখানে হাজারো মানুষের উপস্থিতি আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা তারেক রহমানকে ঘিরে জনমনে জমে থাকা অনুভূতিরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।