প্রথমে স্বপ্নের হাতছানি। পরে কৌশলে লিবিয়া নিয়ে মাফিয়াদের হাতে বিক্রি করে নির্যাতন। এক পর্যায়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারণা চক্র। জেল-জুলুম আর নির্মম অত্যাচার সহ্য করে ফিরে আসেন দেশের মাটিতে। সেখানেও নিস্তার নেই, আইনে আশ্রয় নেয়ায় উল্টো সাজানো মামলায় ভূক্তভোগিরাই জেল খাটেন। এমনই ঘটনা ঘটেছে মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের চরবাজিতপুর গ্রামের আসাদুল ইসলামের পরিবারে।
ভূক্তভোগি পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর জেলা সদরের ধুরাইলের আসাদুল ইসলাম। স্থানীয় দুর্গাবর্দী এলাকার সাহেব আলী বেপারীর ছেলে আবুল হাসান ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখান আসাদুলের ছোট ভাই শহিদুল ইসলামকে। মাত্র ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি নেয়ার চুক্তি হয় আসাদুলের সঙ্গে। সেই হিসেবে পুরো টাকা দিয়েই গত বছরের ২৩ জুলাই লিবিয়া নেয় শহিদুলকে। এর কিছু দিন পরে শহিদুলকে বিক্রি করে দেন মাফিয়াদের কাছে। পরে পরিবারের কাছে মুক্তিপন দাবি করা হয়। পরবর্তীতে আরও ২৮ লাখ টাকা দিলে মুক্ত হয় শহিদুল। এ ঘটনার পরে আইএমও-এর মাধ্যমে ১৩ নভেম্বর শহিদুল দেশে ফিরে আসেন।
পরে মানবপাচারকারী আবুল হাসানসহ তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে মাদারীপুর আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় আবুল হাসান জেল হাজতে রয়েছেন। কিন্তু এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে আবুল হাসান তার খালা নাছিমা বেগমকে দিয়ে উল্টো একটি মানবপাচারের মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় শহিদুল, তার মা ও বোনকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়। এমন প্রতারণায় ক্ষুদ্ধ স্থানীয়রা। তাদের দাবি, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আসাদুল ও তার পরিবারকে উল্টো হয়রানি করা হচ্ছে।
ভূক্তভোগি আসাদুল ইসলাম বলেন, “আমার ছোট ভাইকে ৪৮ লাখ টাকা দিয়েও ইতালি নেয়নি দালাল আবুল হাসান। তার বিরুদ্ধে মামলা করায় উল্টো সে একটি সাজানো মামলা দিয়ে আমার ভাই, বোন ও বৃদ্ধা মাকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। আমরা মামলার ন্যায় বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, এখন তার মামলাতেই আমার পরিবারের সবাই জেল খাটছে। আবুল হাসান তার খালা নাছিমা বেগমকে দিয়ে যে মামলা করেছে, সেখানে যে পাসপোর্ট দেখিয়েছে, সেটাও গোপালগঞ্জের একটি ছেলের। এমন ভয়াবহ প্রতারণা করায় আমার পরিবার এখন নিঃস্ব। এর বিচার দাবি করি।”
নাছিমার এলাকায় গেলে সাইদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, “দীর্ঘ দিন ধরে আবুল হাসান ও তার খালা নাছিমা এমন প্রতারণা করে আসছে। মানুষকে হয়রানি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মামলায় নাছিমার ছেলে নিখোঁজ উল্লেখ করলেও মূলত তার ছেলে ইতালি রয়েছে। তার সঙ্গে এলাকাবাসীর অনেকেই কথা বলছে। এমন প্রতারকদের গ্রেফতারের দাবী জানাচ্ছি।”
এব্যাপারে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “মাদারীপুরে মানবপাচারকারীরা কৌশলে পাল্টাচ্ছে। কোনো ভুক্তভোগি পরিবার মামলা দিলে উল্টো সাজানো মামলা দিয়ে সেই পরিবারকেই হয়রানি করেন। তাই জেলা পুলিশ বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। যদি ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “গত বছর মাদারীপুর জেলায় মানবপাচার আইনে অন্তত শতাধিক মামলা হয়েছে। যেখানে ৫ শতাধিক দালালকে আসামী করা হয়েছে। মাদারীপুরের ৬০টি ইউনিয়নে অন্তত ১২০ জন মানবপাচারকারী রয়েছে, যাদের অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় মামলা হলেও ধরাছোয়ার বাইরে থাকে। গত বছরে ৬০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, বাকিরা জামিনে রয়েছেন।”
এদিকে নাছিমার বাড়ীতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মেয়ে বলেন, “আমরা মামলার বিষয় কিছু জানি না। আমার খালাতো ভাই আবুল হাসান সব জানে।”
কেকে/এলএ