ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে চলতি মৌসুমে সরিষা ও ধনিয়া চাষকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হয়েছে মৌচাষ কার্যক্রম। সরিষা ও ধনিয়া ফুলের নির্যাস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের প্রাকৃতিক মধু, যার বাজার মূল্য প্রায় কোটি টাকা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নবীনগর উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১০৫ হেক্টর জমিতে সরিষা এবং ৫২৫ হেক্টর জমিতে ধনিয়ার আবাদ হয়েছে। এ সব ফসলের ফুলে পর্যাপ্ত পরাগ ও নির্যাস থাকায় মৌচাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নবীনগরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০৫টি মৌবক্স। এ সব মৌবক্স থেকে চলতি মৌসুমে প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের আনুমানিক ২৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ণ বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন ফসলের ফলন ও গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, ধনিয়া, শাকসবজি ও ফলজাতীয় ফসলে মৌমাছির উপস্থিতি পরাগায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এতে ফুল ঝরে পড়ার হার কমে, ফল ধারণ বৃদ্ধি পায় এবং বীজের আকার ও ওজন উন্নত হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, রছুল্লাবাদ, সাতমোড়া, শ্রীরামপুর, জিনদপুর, শ্যামগ্রাম ও রতনপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ সরিষা এবং ধনিয়ার মাঠে সারিবদ্ধভাবে মৌবক্স বসানো হয়েছে। সরিষা, ধনিয়া ও অন্যান্য ফসলের ফুল থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে মৌমাছি গুলো মৌবক্সে ফিরে আসছে, যা মধু উৎপাদন করছে।
মৌচাষ উদ্যোক্তা কালঘড়া গ্রামের আনিস জানান, তিনি গত দুই দশক ধরে নিয়মিত মৌচাষ করে আসছেন। এতে তিনি নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি অনেক তরুণ ও আগ্রহী কৃষককে মৌচাষে প্রশিক্ষণ দিয়ে এই পেশায় যুক্ত করেছেন। তার মতে, মৌচাষ কম খরচে অধিক লাভজনক একটি উদ্যোগ, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
একই গ্রামের কৃষক ফয়সাল আব্বাস জানান, চলতি বছর উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় তিনি প্রথমবারের মতো মৌচাষ শুরু করেছেন। সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে তিনি ৫টি অত্যাধুনিক মানের মৌকলোনি ও মৌবক্স পেয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ কেজি মিশ্র মধু সংগ্রহ করে তা বিক্রিও করেছেন। এতে তিনি আশাবাদী যে ভবিষ্যতে মৌচাষের পরিধি আরও বাড়াতে পারবেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, “মৌমাছি শুধু ফুলের নির্যাস থেকে মধু সংগ্রহই করে না, একই সঙ্গে পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষাসহ অন্যান্য ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।”
তিনি আরও বলেন, “কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মৌচাষ সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রণোদনা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, “পরিকল্পিতভাবে মৌচাষ সম্প্রসারণ করা গেলে নবীনগর উপজেলায় মধু উৎপাদন একটি টেকসই ও রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।”
কেকে/এলএ