চা-বাগান অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলায় প্রাথমিক শিক্ষার করুণ অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা আজও অবহেলিত। জেলার ৯২টি চা-বাগানের মধ্যে ৬৯টিতে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেখানে পড়াশোনা করা প্রায় ৯ হাজার শিশু দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবঞ্চিত অবস্থায় রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও এসব বিদ্যালয়ে নেই উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, আসবাবপত্র কিংবা ন্যূনতম শিক্ষা উপকরণ।
কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম সুনছড়া (দেবলছড়া) চা-বাগানে সরেজমিনে দেখা যায়, টিলার ওপর অবস্থিত একটি ভাঙা টিনশেড ঘরে চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। হেলে পড়া ঘরের ভেতরে গাদাগাদি করে বসে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করছে। একই ঘরে বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাগ করা হয়েছে দুইটি শ্রেণিকক্ষ। জায়গার অভাবে পাশের হেড ক্লার্কের বাংলোর বারান্দায়ও ক্লাস নিতে হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে মাত্র তিনজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ একজন শিক্ষক যে সম্মানি পান তা একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরির সমান। কোনো কোনো শিক্ষকের মাসিক সম্মানী মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা বলে জানান সহকারী শিক্ষক মিটুন কুর্মী।
তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে পড়াতে হয়, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ তাকায় না।’
একই চিত্র শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুরভুরিয়া চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। জাতীয়করণের ১১ বছর পার হলেও বিদ্যালয়টিতে এখনো পাকা ভবন নেই। টিনশেডের ছোট চারটি কক্ষে ১৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। বেঞ্চের অভাবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী মাটিতে বসে ক্লাস করে। বর্ষায় ঘরে পানি ঢুকে যায়, গরমে শ্রেণিকক্ষ অসহনীয় হয়ে ওঠে।
জানা যায়, বিদ্যালয়টির জন্য ২০২৪ সালের শেষ দিকে পিইডিপি-৪ প্রকল্প থেকে পাঁচতলা ভবনের বরাদ্দ মিললেও সময়মতো দরপত্র না হওয়ায় অর্থ ফেরত গেছে।
প্রধান শিক্ষক সবিতা রানী দেব বলেন, ‘বহুবার আবেদন করলেও এখনো ভবন নির্মাণ হয়নি।’
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, জেলার চা-বাগানের বিদ্যালয়গুলো বাগান কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে এবং সরকার শুধু বিনামূল্যের বই সরবরাহ করে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার গড়ে ৫০-৬০ শতাংশ। প্রাথমিকেই ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে, মাধ্যমিকে গিয়ে ঝরে পড়ে ৭০-৮০ শতাংশ।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, বারবার আন্দোলন ও স্মারকলিপি দিলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
দ্রুত সময়ের মধ্যে চা-বাগানের বিদ্যালয়গুলো সরকারিকরণের দাবি জানান তারা।
চা শ্রমিকদের জীবন নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক ড. আশরাফুল করিম বলেন, ‘প্রতিটি চা-বাগানে অন্তত একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা প্রয়োজন। শিক্ষা ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তন সম্ভব নয়।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘চা-বাগানে শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
কেকে/এমএ