আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে নির্বাচনি তৎপরতা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। একাধিক রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে এ আসনে লড়াই হবে বহুমুখী।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনপ্রিয়তার বিচারে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতা আজহারুল ইসলাম মান্নান কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ভোটের সমীকরণ এখনো পুরোপুরি খোলা।
দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকা আজহারুল ইসলাম মান্নান এলাকাবাসীর কাছে একজন পরিচিত মুখ। দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ তাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় দৃশ্যমান করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া, সনমান্দি, জামপুর ও পিরোজপুর ইউনিয়নে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত। এসব এলাকায় মান্নানের পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে সাদীপুর, বারদী এবং আদমজী শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সংগঠিত সমর্থন ধরে রেখেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে, সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় সাবেক সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং বহিষ্কৃত সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বলয়ের কারণে উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোট কিছুটা বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, দমন-পীড়নের রাজনীতি এই নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আজহারুল ইসলাম মান্নানের বড় ছেলে, জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীব তৎকালীন আ.লীগ সরকার আমলে কারাবরণ করেন। দলটি এটিকে ত্যাগ ও আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।
আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে। সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত উন্নয়ন ও সুশাসন থেকে বঞ্চিত। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ তাদের রায় ব্যালটের মাধ্যমে জানাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচিত হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক সমস্যা এবং নাগরিক সেবার বিষয়গুলো সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরব।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বহিষ্কৃত সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন এই এলাকার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মানুষ আমাকে আমার কাজের মাধ্যমেই চেনে। দল নয়, উন্নয়নই আমার প্রধান পরিচয়।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি আগে সংসদে থেকে এই এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। তারা এখনো আমার পাশে আছেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রিন্সিপাল ড. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা সৎ, যোগ্য ও নীতিবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করি। আমাদের কর্মীরা সংগঠিতভাবে মাঠে কাজ করছে।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শাহজাহান শিবলী বলেন, ‘এই আসনে সাধারণ মানুষ বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজছে। আমরা সেই বিকল্প সামনে আনতে চাই।’
এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের আতিকুল রহমান নান্নু মুন্সি (বটগাছ) এবং গণঅধিকার পরিষদের ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী (ট্রাক) নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকার এক নারী ভোটার বলেন, ‘এখানে একাধিক প্রার্থী শক্ত অবস্থানে আছেন। শেষ পর্যন্ত আমরা দেখব, কে আমাদের কথা শোনে এবং কে এলাকার জন্য কাজ করতে পারে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের ফল নির্ভর করবে মূলত ভোটার উপস্থিতি, বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব এবং নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশের ওপর। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিএনপির প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে থাকলেও শেষ মুহূর্তে নিরপেক্ষ ভোটারদের সিদ্ধান্তই জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।
কেকে/বি