ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দিনাজপুর–১ (বীরগঞ্জ–কাহারোল) নির্বাচনী আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হবে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের মো. মনজুরুল ইসলাম মনজু এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মো. মতিউর রহমানের মধ্যে।
এই আসনে অন্য চারজন প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির মো. শাহিনুর ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের অ্যাডভোকেট চাঁন মিয়া, জাকের পার্টির প্রার্থী রঘুনাথ রায় এবং গণ অধিকার পরিষদের মো. রিজওয়ানুল হক ইসলাম।
বিগত দিনে জোটগত নির্বাচন করলেও এবার ভোটের মাঠে দুই দলই কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে শেষ মুহূর্তে এই আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণা। প্রার্থীরা ও তাদের কর্মীরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেদের ও দলের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে নিজ নিজ প্রতীকে ভোট চাইছেন। সভা, সমাবেশ, মাইকিং, স্লোগান ও ব্যানারে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সময় এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তবে ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মো. আনিসুল হক রিজু, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত সৈয়দ রেজা হোসেন নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে চারদলীয় ঐক্যজোটের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ-হেল-কাফি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার মৃত্যুতে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোরঞ্জন শীল গোপাল জয়ী হন।
পরবর্তীতে মনোরঞ্জন শীল গোপাল আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ২০০৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন। ধারাবাহিকভাবে তিনি সংসদ সদস্য থাকলেও ২০২৩ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব জাকারিয়া জাকারের কাছে পরাজিত হন। এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের দুর্গ দখলে নিতে মরিয়া বিএনপি ও জামায়াত। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব প্রার্থীই আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন।
উল্লেখ্য, কাহারোল ও বীরগঞ্জ—এই দুই উপজেলা এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর–১ আসন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৭ হাজার ১৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ৯১৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ২১২ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন।
বীরগঞ্জ উপজেলায় মোট ভোটার ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯১ জন, নারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯১৯ জন এবং হিজড়া ১ জন। কাহারোল উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬৯ হাজার ৫২৮ জন, নারী ৬৯ হাজার ২৯৩ জন এবং হিজড়া ১ জন।
সরকারিভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের পৃথক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও জনসংখ্যার হার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বীরগঞ্জে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং কাহারোলে প্রায় ৪৬ শতাংশ হিন্দু ভোটার রয়েছে। সে হিসেবে এই আসনে মোট হিন্দু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। নির্বাচনের ফলাফলে এই সংখ্যালঘু ভোট একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচনী বিশ্লেষক বলেন, “হিন্দু ভোটারদের উপস্থিতি এই নির্বাচনের ফলাফলে বড় ফ্যাক্টর। প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের কৌশলই দিনাজপুর–১ আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।”
সাধারণ ভোটারদের মতে, দীর্ঘদিন তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি। অতীতে দিনের ভোট রাতে দেওয়া এবং মৃত ব্যক্তির নামেও ভোট দেওয়ার অভিযোগ ছিল। তবে এবার সেই পরিস্থিতি নেই। তারা আশা করছেন, স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন।
কেকে/এলএ