আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ভোটগ্রহণের পরিবেশ নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উপজেলার মোট ৫২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৪টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে সব ভোটকেন্দ্রকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপ নির্বাচনি পরিবেশ কতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অতীতের নির্বাচনি সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দ্বন্দ্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেই অধিকাংশ কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে পুরো উপজেলায় নির্বাচনকালীন সময়ে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবার ব্যতিক্রমধর্মী নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো উপজেলা জুড়ে মোতায়েন করা হচ্ছে দুই প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), তিন প্লাটুন সেনাবাহিনী এবং এক প্লাটুন ব্যাটেলিয়ান আনসার। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন ১৩ জন করে আনসার সদস্য এবং অস্ত্রসহ তিনজন আনসার সদস্য। এর বাইরে পুলিশ সদস্যদের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করে সেখানে বাড়তি নজরদারি চালানো হবে। সেনাবাহিনীর রিজার্ভ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নির্বাচনি এলাকায় তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সক্রিয় রয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একটি উপজেলায় মোট কেন্দ্রের এত বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এতে বোঝা যায়, নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের উদ্বেগ ও চাপ কতটা বেড়েছে। নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কোনো ঘাটতি থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এ আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
ভোটগ্রহণের দিন কেন্দ্রের আশপাশে চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। নির্ধারিত সীমার বাইরে অবস্থান, অবৈধ জমায়েত কিংবা সন্দেহজনক গতিবিধির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ভোট শেষে ব্যালট ও নির্বাচনি সরঞ্জাম স্থানান্তরের সময়ও নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখা হবে।
মাঠপর্যায়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এত বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপস্থিতি অনেকের মধ্যে আস্থার পাশাপাশি শঙ্কাও তৈরি করছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অতীতে কেন্দ্র দখল, ভোটগ্রহণে বাধা কিংবা সংঘর্ষের অভিযোগ ছিল, সেসব এলাকার ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি।
একজন ভোটার বলেন, নিরাপত্তা দরকার, কিন্তু এত বাহিনী দেখে মনে হয় পরিস্থিতি খুব স্বাভাবিক না। ভোট দিতে যাওয়ার সময় কী হয়, সেটা নিয়েই চিন্তা।
আরেকজন ভোটার জানান, অতীতের অভিজ্ঞতার কারণেই এবার প্রশাসন শুরু থেকেই কড়া অবস্থানে রয়েছে, তবে এর ফলে ভোটার উপস্থিতিতে কী প্রভাব পড়বে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রাখা এবং কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত রাখা হয়েছে। বাস্তবতা হলো—উপজেলার অধিকাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পুরো এলাকাজুড়ে নির্বাচন একটি চাপা উত্তেজনার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে খানসামা উপজেলায় এবারের নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশের বদলে নিরাপত্তা ও সতর্কতার ছায়ায় আবদ্ধ। ৪৪টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠছে—এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে, নাকি নির্বাচনী পরিবেশের স্বাভাবিকতাকেই আরও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
খানসামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল বাছেত সরদার বলেন, ৫২টি ভোটকেন্দ্রের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কেউ যদি সহিংসতা বা ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন,নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সব ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেকে/ এমএস