রাত পোহালেই দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। টানা ২০ দিন প্রচারণার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে নির্বাচনি প্রচারণা। এবার কে জিতবে আর কে হারবে, এ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চায়ের কাপে উঠছে ঝড়। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকরা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছড়াচ্ছে উত্তেজনাও।
ইতোমধ্যে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এ নির্বাচনে সহিংসতার আভাস মিলছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র থেকে ফলাফল নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সে ব্যাপারে যা করার প্রয়োজন, তা করবে এ দলটি। অপরদিকে দীর্ঘসময় ধরে অভিযোগ আছে, মাঠ প্রশাসনের অনেকটাই দখলে নিয়েছে জামায়াত সমর্থিতরা। যে কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কৌশল হচ্ছে কোনোভাবে ব্যালট বাক্স রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নেওয়া। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই সংঘাতের শঙ্কা বিস্তর।
তারা আরও বলছেন, পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা করে ফলাফল দিতে হবে। কারণ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি না হলে ফলাফল না দিয়ে ব্যালট বাক্স রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ জামায়াতের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা যায়, ভোটকেন্দ্রে কোনো অবস্থাতেই বিএনপির আধিপত্য মেনে নেবে না নেতাকর্মীরা। তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে জামায়াত কর্মীরা তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করবে। ভোটকেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হলে প্রয়োজনে ভোট গণনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে নেওয়া হবে ব্যালট বাক্স।
দুই দলের এ আগ্রাসী পরিকল্পনা থেকে জনমনে আশঙ্কা জন্মেছে—জাতির সামনে আরও একটি সহিংস নির্বাচন অপেক্ষা করছে। যার ফলে হতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। যার অনেকটাই আঁচ করা যায়—নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া সহিংসতার চিত্রেও।
তথ্যমতে, গত ১০ দিনে (১-১০ ফেব্রুয়ারি) ৫৮টি সহিংসতার ঘটনায় ৪৮৯ জন আহত এবং ২ জন নিহত হয়েছে। এর আগে জানুয়ারির শেষ ১০ দিনে (২১-৩১ জানুয়ারি) ৪৯টি সংঘর্ষে ৪১৪ জন আহত এবং ৪ জন নিহত হন।
গতকাল মঙ্গলবার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে আসকের ডকুমেন্টেশন ইউনিট এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ করে আসক দেখছে, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেশি। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতি ১০ দিন অন্তর তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এ ঘটনাগুলোতে হতাহতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জানুয়ারির রাজনৈতিক সহিংসতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা ফেব্রুয়ারি মাসেও অপরিবর্তিত আছে। অর্থাৎ নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির মাঠ ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) তথ্যমতে, এ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে ইন-পার্সন ভোটিংয়ের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে ভোটের দিনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত দল দুটির ব্যাপক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। একে অপরের প্রতি দেখাচ্ছে আগ্রাসী মনোভাব। ফলে অধিকাংশ আসনে এ দল দুটির মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্রে বাঁশের লাঠি মজুত করার অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে বিএনপিসমর্থিত প্রার্থী ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সদরের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ অভিযোগ করেন।
জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘তারা (জামায়াত) খুব পরিকল্পিতভাবে ভোটকেন্দ্রে এ ধরনের বাঁশের লাঠি কিংবা আমরা এ রকমও শুনেছি, দেশি অস্ত্রশস্ত্র জমা করছেন। সেগুলো তারা ভোটকেন্দ্রে নিয়ে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন।’
অন্যদিকে বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতে ইসলামীর এজেন্টদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি বলেন, নানা জায়গায় নির্বাচনি অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার দলটির মগবাজার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াত আমিরের সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনি পর্যবেক্ষণের ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। পরে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখছি না। নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এ সময় নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন বিশেষ একটি দলের দিকে হেলে পড়েছে—অভিযোগ করে তিনি বলেন, মানুষ কোনোভাবেই একটি পাতানো নির্বাচন মেনে নেবে না। তিনি বলেন, অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা হয়নি। সন্ত্রাসীদের হাতে আছে। আরও আগেই এগুলো উদ্ধারে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
ঢাকাসহ সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগেই সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ ছাড়া এসব কেন্দ্রে যারা পুলিশের দায়িত্ব পালন করবে, তাদের সঙ্গে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সারা দেশে এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নির্বাচনি নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা হয়েছে, সারা দেশে ভোটকেন্দ্রের মধ্যে যেগুলো সাধারণ ভোটকেন্দ্র, সেগুলোতে অস্ত্রসহ দুজন পুলিশ, আনসার ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে।
মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরের যেসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে তিন থেকে চারজন অস্ত্রসহ পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন। তবে আনসার, ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশের সংখ্যা একই পরিমাণে থাকবে। অন্যদিকে মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে যেসব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে, সেখানে অস্ত্রসহ পুলিশ থাকবে চারজন করে।
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, “এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। তাদের সঙ্গে সাপোর্টিং হিসেবে আরও ৩০ হাজার পুলিশ বাহিনীর সদস্য।”
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, এবারের নির্বাচনে সারা দেশের পুলিশের ৮৮ শতাংশই নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালন করবে।
কেকে/এলএ