ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গাজীপুরের পাঁচটি আসনে শেষ মুহূর্তের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা জয়ের বিকল্প কোনো ভাবনাই করছেন না। মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের চাঙাভাব, টানা গণসংযোগ ও বড় সমাবেশগুলো সে আত্মবিশ্বাসই প্রতিফলিত করছে।
গাজীপুর জেলায় মোট ভোটার ২৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৯ জন, নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩৪ জন। শিল্পসমৃদ্ধ ও রাজধানীঘেঁষা এই জেলা বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটের চিত্র বদলাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত ২৭ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের রাজবাড়ি মাঠে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের জনসভা জেলার রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বিপুল জনসমাগম হয়, যা নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে। সভা থেকে বিএনপি নেতারা ঘোষণা দেন—গাজীপুরের পাঁচটি আসনেই তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন।
এর এক সপ্তাহ পর একই মাঠে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের জনসভাও ছিল জনসমুদ্রে পরিণত। নারী ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জামায়াত নেতারা সেখান থেকেও পাঁচ আসনে বিজয়ের প্রত্যাশার কথা জানান।
গাজীপুর-১: কালিয়াকৈরে দ্বিমুখী লড়াই
কালিয়াকৈর উপজেলা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তিনটি থানা নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার ৭ লাখ ২০ হাজার ৯৩৯ জন। বিএনপির প্রার্থী মেয়র মজিবুর রহমান দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। দলীয় কোন্দল ভুলে সবাই তার পক্ষে একজোট হয়ে মাঠে নেমেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ও সাবেক সচিব মো. শাহ আলম বকশী প্রশাসনিক পরিচিতির কারণে আলোচনায় রয়েছেন। ১১ দলীয় জোটের সমর্থনে তিনিও আশাবাদী।
গাজীপুর-২: ভিআইপি আসনে নজরকাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা
জেলার প্রশাসনিক ও শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখের বেশি। বিএনপির প্রার্থী এম. মঞ্জুরুল করিম রনি তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে এগিয়ে আছেন বলে দাবি দলের।
এদিকে, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির আলী নাছের খানও জোটের পূর্ণ সমর্থনে ভোটের মাঠে সক্রিয়।
গাজীপুর-৩: ক্লিন ইমেজ বনাম বিভক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
শ্রীপুর উপজেলা ও গাজীপুর সদর অংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে সাধারণ ভোটারদের আস্থায় এগিয়ে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিমত।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুহাম্মদ এহসানুল হক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন এখানে ভোটের সমীকরণ জটিল করে তুলেছেন।
গাজীপুর-৪: কাপাসিয়ায় ঐতিহ্য বনাম পরিবর্তনের লড়াই
ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত কাপাসিয়ায় এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। বিএনপির প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নান পিতার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সামনে এনে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাজ ও ব্যক্তিগত পরিচিতিকে পুঁজি করে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন।
গাজীপুর-৫: চার প্রার্থীর ত্রিমুখী নয়, চতুর্মুখী লড়াই
কালীগঞ্জ ও গাজীপুর সিটির অংশ নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী একেএম ফজলুল হক মিলন এগিয়ে থাকলেও জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও জনতার দলের প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয়।
তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন। তারা প্রার্থী বাছাইয়ে যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
কেকে/ এমএস