ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ। গতকাল জেলার চারটি আসনের ৫৫৪টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনি সরঞ্জাম পৌঁছানো হয়েছে। জেলার ১, ২, ৩ ও ৪ আসনে এবার বিএনপি, ১১ দলীয় জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এখনো কোনো প্রার্থীই নিশ্চিত জয়ের অবস্থানে নেই, ফলে নির্বাচনি সমীকরণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী), মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া), মৌলভীবাজার-৩ (মৌলভীবাজার সদর-রাজনগর) ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) এই চারটি আসনে মোট ২৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার তারা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিতে চান। বিশেষ করে তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের টানতে প্রার্থীরা আলাদা কৌশল নিচ্ছেন।
দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততাও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের ভোটব্যাংক নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। বিএনপি, ১১ দলীয় জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সক্রিয় হলেও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
মৌলভীবাজার জেলায় ৯২টি চা-বাগান রয়েছে। বাগানের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, এবার তারা প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে থাকবেন না। যারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে, তাকেই ভোট দেওয়া হবে। বরাবরই চা-শ্রমিকদের ভোটের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা থাকে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, মৌলভীবাজারে ২৩,৭৩১টি পোস্টাল ভোটসহ মোট ভোটার রয়েছেন ১৬ লাখ ১৪,৯৩০ জন। জেলার চার আসনেই জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ৯২টি চা-বাগানে কর্মরত তিন লক্ষাধিক শ্রমিক।
মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ, জামায়াতের মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বেলাল আহমেদের মধ্যে ত্রি-মুখী লড়াইয়ের আভাস। এই আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৩৭,৮১৬। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৭২,৯৯৮, মহিলা ভোটার ১,৬৪,৮১৬ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২ জন। ভোটগ্রহণ হবে দুই উপজেলায় ১১৩টি স্থায়ী ভোটকেন্দ্রে ৬৩২টি ভোটকক্ষে (৬১০ স্থায়ী, ২২ অস্থায়ী)।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে চারমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম, জামায়াতের মো. সায়েদ আলী, স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাস খান ও ফজলুল হক খানের মধ্যে। এখানে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ৩,০৩,০২০। এর মধ্যে পুরুষ ১,৫৭,১২৮, মহিলা ১,৪৫,৮৯২। ভোটগ্রহণ হবে ১০৩টি স্থায়ী কেন্দ্রে ৬০০টি ভোটকক্ষে (৫১৫ স্থায়ী, ৮৫ অস্থায়ী)।
মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনে বিএনপির এম নাসের রহমান, ১১ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিস প্রার্থী মাওলানা আহমদ বিলাল এবং জামায়াতের আব্দুল মান্নানের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ৪,৮৬,২১২। এর মধ্যে পুরুষ ২,৪৮,১৩১, মহিলা ২,৩৮,০৭৭ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৪ জন। ভোটগ্রহণ হবে দুই উপজেলায় ১৭৫টি স্থায়ী কেন্দ্রে ৯৩৪টি ভোটকক্ষে (৮৪৭ স্থায়ী, ৮৭ অস্থায়ী)।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে বিএনপির মুজিবুর রহমান চৌধুরী, স্বতন্ত্র প্রার্থী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া মধু এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা শেখ নুরে আলম হামিদীর মধ্যে লড়াই। জোটের শরিক এনসিপির প্রীতম দাশ প্রার্থী থাকায় সমীকরণ আরও জটিল। ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার ৪,৮৭,৮৮৮। এর মধ্যে পুরুষ ২,৪৬,১৯৭, মহিলা ২,৪১,৬৮৯ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২ জন। ভোটগ্রহণ হবে দুই উপজেলায় ১৬৩টি স্থায়ী কেন্দ্রে ৯৩৯টি ভোটকক্ষে (৮৯৮ স্থায়ী, ৪১ অস্থায়ী)।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের চার আসনেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের কৌশলের ওপর।
নির্বাচনকে ঘিরে চারটি আসনে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না সৃষ্টি হওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। ৫৫৪টি ভোটকেন্দ্রে ইতোমধ্যে নির্বাচনি সরঞ্জাম, ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার পৌঁছে গেছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। বাড়তি নজরদারিও থাকবে।
ভোটের পরিবেশ নিয়ে স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করছেন নির্ভয় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবেন।
কেকে/এলএ