রাত পোহালেই ভোট। তার আগে ময়মনসিংহের এগারো আসনের দুটিতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’—এর আভাস পাওয়া গেছে। এ নিয়ে চলছে টানটান উত্তেজনা। কয়েকটি আসনে বিএনপির সঙ্গে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে তাদের বিদ্রোহী ও জামায়াত প্রার্থীদের সঙ্গে। জামানত হারাবেন ভিন্ন জোট ও এনসিপির প্রার্থীরা।
হামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তাদের সমর্থকদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ রয়েছে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভোট দেবেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ২৫ শতাংশ ভোট পাবেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা।
সূত্র মতে, প্রার্থী ভেদে কোনো আসনে বিএনপি আবার কোনো আসনে জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোট পাবে। এদিকে ময়মনসিংহের ১৩৬৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৩ টিকে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে জেলাজুড়ে নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’—এর আভাস পাওয়া গেছে। বিষয়টি নির্ভর করছে অন্তবর্তী সরকার ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার ওপর। ঢাকা থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পরই স্থানীয় প্রশাসন এই ২ আসনে প্ল্যান বাস্তবায়ন করবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে এ খবর লেখার সময় পর্যন্ত সূত্রটি এমন তথ্যই নিশ্চিত করেছে। ময়মনসিংহের ১১টি আসনে ভোটের ক্ষেত্রে গতকাল পর্যন্ত প্রশাসন নিরপেক্ষ ছিল। আজ ভোটের দিন সকালে এই ২ আসনের চিত্র পাল্টে যাবে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এরই মধ্যে সকল প্রস্ততি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান ওমর রুবেল। তাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। এখানে আওয়ামী লীগ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোট অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। এই আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাস্টিং ভোটের অধিকাংশই পাবেন ঘোড়া প্রতীকের রুবেল। তার কর্মী নজরুল ইসলাম খুন হওয়ার পর এই আসনে ভোটের চিত্র পাল্টে যায়। প্রচারণা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ভোট এবং ফলাফল নিয়ে ২ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা চলছে। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা প্রিন্সের পক্ষে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা যায়, ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। এখানে ১০ দলীয় জোটের শক্তিশালী প্রার্থী মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা কামরুল আহসান এমরুল। নির্বাচনে এই ২ প্রার্থীর মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। প্রচারণায় বিএনপির ভোটাররা প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান এবং শক্তির জানান দিয়েছেন। জামায়াতের ভোটাররা প্রচারণার সময় ব্যাপক শোডাউন করেন। শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী। তাদের নিরব ভোট ব্যাংক নির্বাচনে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই আসনে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি নির্ভর করছে অন্তবর্তী সরকার এবং ওই গোয়েন্দা সংস্থার চাওয়া-পাওয়ার ওপর।
সূত্র জানায়, প্রশাসন নির্বাচন উপলক্ষে জেলাজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও ১১টি আসনের মধ্যে ৮টিতে ব্যাপক গোলযোগ হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। আসনগুলো হচ্ছে- ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া), ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা), ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর), ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া), ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল), ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ), ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) ও ময়মনসিংহ-১১ (ভালকুা)। প্রতিটি আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যাপক গোলযোগ হবে বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। এক্ষেত্রে স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং কন্ট্রোল রুমে থাকা অতিরিক্ত ফোর্স দিয়ে গোলযোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জানা যায়, ময়মনসিংহের ১১টি আসনে মোট ভোটার ৪৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৪ লাখ ৬ হাজার ৮৯২, নারী ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ১৬৬ ও তৃতীয় লিঙ্গের ৪১ জন। ১১ আসনের ১৩৬৫ কেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৩ টিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ত্রিশাল ও ভালুকায়। এই ২ আসনে ৭২টি করে কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া সদরে ৬৫ ও গফরগাঁওয়ের পাগলার ৫৮টি কেন্দ্রকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অন্য উপজেলার মধ্যে ফুলবাড়িয়ায় ৫০, ঈশ্বরগঞ্জে ৪৭, নান্দাইলে ৪৩ ও গৌরীপুরে ৪২টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হালুয়াঘাটের ২০, ধোবাউড়ার ২৫, ফুলপুরের ১৯, তারাকান্দার ২৯, মুক্তাগাছার ১৯ এবং গফরগাঁওয়ের ২২টি কেন্দ্র।
নিরাপত্তা নিয়ে ময়মনসিংহের রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বুধবার রাতে দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, “জনগণের কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। কোনো কেন্দ্রে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোরভাবে দমন করবেন।” তিনি আরও বলেন, “কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।”
কেকে/এজে