মৌলভীবাজারের রাজনগর ও বড়লেখা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় সমৃদ্ধ গ্রামীণ ঐতিহ্য শীতল পাটি শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিকের মাদুর, ফ্লোরম্যাট ও টাইলসের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষের এই লোকজ শিল্প। অথচ একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে গৃহকর্তার বসার জন্যও ব্যবহৃত হতো শীতল পাটি। গরমের দিনে এই পাটি দেহ ও মনকে শীতলতা দিত বলে এর কদর ছিল ব্যাপক।
জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ধুলিজুড়া ও উত্তরভাগ ইউনিয়নের যুগিকোনা, বড়লেখা উপজেলার দাসেরবাজার ও তালিমপুর ইউনিয়নে এখনও কিছু কারিগর ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে রাজনগরের ধুলিজুড়া গ্রামের কারুশিল্পীদের তৈরি শীতল পাটির একসময় ব্যাপক খ্যাতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে স্বল্পমূল্যের প্লাস্টিক মাদুরের কারণে বিক্রি কমে যাওয়ায় শতাধিক কারুশিল্পী পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন।
ধুলিজুড়া গ্রামের কারিগর অরুণ চন্দ্র দাস জানান, ৪–৫ হাতের কারুকাজ করা একটি শীতল পাটি তৈরি করতে ৩০–৩৫ দিন সময় লাগে এবং এতে বেত ও রং বাবদ খরচ হয় প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। পালঙ্কের জন্য ‘নঙা’ করা পাটির দাম ২৮–৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়, যা সাধারণত শৌখিন ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ব্যবহার করেন। সাধারণ মানের পাটি ৫–৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আগে বিয়ে বা গরমের মৌসুমে ব্যাপক বিক্রি হলেও এখন প্লাস্টিকের মাদুর বাজার দখল করেছে।
তিনি আরও জানান, সরকারি সহযোগিতায় তিনি ২০১৩ সালে জাপান ও ২০২৩ সালে চীনে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প মেলায় অংশ নিয়ে ধুলিজুড়ার শীতল পাটি প্রদর্শন করেছেন, যেখানে ‘নঙা’ আঁকা পাটি বেশ সমাদৃত হয়েছে। তার সঙ্গে গ্রামের হরেন্দ্র দাস ও গীতেশ দাস অংশ নেন।
স্থানীয় কারিগর পমেশ দাস, দ্বিজেন্দ্র দাস, শৈতেন্দ্র দাস, গোপাল দাস, সুশীল দাস ও গোবিন্দ দাসসহ অনেকে জানান, কম দামে প্লাস্টিক পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে। ফলে অনেকে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন।
কারুশিল্পীরা বলেন, “শীতল পাটি তৈরির মূল উপাদান বেত প্রস্তুতে প্রচুর শ্রম লাগে, কিন্তু বাজারমূল্য কম হওয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। নকশা ছাড়া পাটি ৪–৫ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও অর্ডার অনুযায়ী মসজিদ, মন্দির বা ব্যক্তির নাম যুক্ত করলে দাম ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।”
ব্যাংকার আব্দুল হালিম বলেন, “শীতল পাটির এখনও চাহিদা রয়েছে, কিন্তু বাজারজাতকরণ সঠিকভাবে হচ্ছে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিদেশেও রপ্তানি সম্ভব।”
কেকে/এলএ